Wednesday, July 17, 2013

এয়ার ফ্রান্স ফ্লাইট ৪৫৯০: অন্তিম যাত্রায় আকাশের রানী কনকর্ড-প্রথম পর্ব























২৫শে জুলাই ২০০০। ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসের নিকটবর্তী শার্ল দ্যা গল আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর। প্যারিসে দু’টি আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর রয়েছে। এক সময় অরলি বিমান বন্দর দিয়েই আন্তর্জাতিক গন্তব্যে বিমান পরিচালনা করা হত। পরবর্তীতে শার্ল দ্যা গল বিমান বন্দর তৈরি হওয়ার পর অরলির গুরুত্ব অনেক কমে যায়।

দুপুর ১২:৩০:  শার্ল দ্যা গল বিমান বন্দরের এয়ার ফ্রান্স চেক ইন কাউন্টারে বেশ ব্যস্ততা। আজকের সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ ফ্লাইট ৪৫৯০ এর জন্য চেক ইনের প্রস্তুতি চলছে। আজকের এই ফ্লাইটটি একটি চার্টার্ড ফ্লাইট অর্থাৎ জার্মানির একটি টুরিস্ট সংস্থা পিটার গিলম্যান ক্রুজ এর আয়োজনে বেড়ানোর একটি কর্মসূচীর আওতায় ১০০ জন জার্মান নাগরিক এয়ার ফ্রান্সের এই ফ্লাইটে নিউইয়র্ক যাচ্ছেন। নিউইয়র্কে তাঁরা ক্রুজ শিপ এম এস ডয়েশল্যান্ডে উঠবেন এবং ১৬ দিন পুরো ক্যারিবিয়ানে বেড়ানোর পর ইকুয়েডরের মান্টায় পৌছবেন। অপর কারণটি হল, এই ফ্লাইটে ব্যবহৃত হবে আকাশের রানী হিসেবে খ্যাত কনকর্ড বিমান।

আধুনিক বিমান চলাচল ইতিহাসে কনকর্ড বিমানটিকে একটি বিস্ময় হিসেবে বিবেচনা করা হয়। অন্যান্য বাণিজ্যিক বিমানের চাইতে একেবারেই আলাদা এই বিমানটি প্রতি ঘণ্টায় প্রায় ২৫০০ কিলোমিটার বেগে উড়তে পারে। আকাশের ৬০ হাজার ফিট উপর দিয়ে মাত্র ৩ ঘণ্টায় এই বিমান লন্ডন থেকে নিউইয়র্কে পৌছাতে পারে যেখানে অন্য বাণিজ্যিক বিমানগুলোর মধ্যে সবচাইতে দ্রুতগতিরটি সময় নেয় প্রায় ৬ ঘণ্টা। ইউরোপ ও আমেরিকার ব্যস্ত ব্যবসায়ীদের কাছে এই বিমানটি সাংঘাতিক জনপ্রিয় তবে কনকর্ডে বিমান যাত্রা খুব একটা আরামপ্রদ নয়। এটির পরিচালনা ব্যয় অত্যন্ত বেশী বিধায় শুধুমাত্র ব্রিটিশ এয়ার ওয়েজ এবং এয়ার ফ্রান্স কনকর্ড বিমান ব্যবহার করে। বিমানটির উৎপাদক বিএসি সাদ এভিয়েশন এ পর্যন্ত মোট ২০টি কনকর্ড বিমান উৎপাদন করেছে যার ১৪টি বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। বিমান চলাচলের ক্ষেত্রে কনকর্ডের রেকর্ড খুব ভাল এবং বিশ্লেষকদের মতে, এই মুহূর্তে কনকর্ডই সবচাইতে নিরাপদ বিমান।

দুপুর ৩:৩০: ফ্লাইট ৪৫৯০ উড্ডয়নের সব প্রস্তুতি শেষ করার পরেও ইঞ্জিন মেকানিকদের নির্দেশে কিছুক্ষণের জন্য যাত্রা স্থগিত করতে হল। মেকানিকরা ডান দিকের ২ নং ইঞ্জিনের রিভার্স থ্রাষ্টারে সমস্যা পেয়েছে। বিমান অবতরণের সময় রিভার্স থ্রাষ্টার পেছন দিকে চাপ সৃষ্টি করে বিমানের গতি কমাতে সাহায্য করে। সমস্যাটি অত্যন্ত ছোট কিন্তু কনকর্ডের নিরাপত্তার জন্য কোন সমস্যাই ছোট নয়। তাই মেকানিকরা ছোট একটি যন্ত্রাংশ বদলে দেয়ার জন্য বিমানটির যাত্রা এক ঘণ্টা বিলম্বিত করা হল। আজকের ফ্লাইটের পাইলট ক্যাপ্টেন ক্রিশ্চিয়ান মার্টি, কো-পাইলট ফার্ষ্ট অফিসার জাঁ মার্কো এবং ফ্লাইট ইঞ্জিনিয়ার গিল জার্ডিনাউ যার যার সীটে বসে প্রি-ফ্লাইট চেক সম্পন্ন করেছেন। ৫৪ বছর বয়েসী ক্যাপ্টেন ক্রিশ্চিয়ান মার্টি এয়ার ফ্রান্সের সবচাইতে অভিজ্ঞতা সম্পন্ন পাইলটদের মধ্যে অন্যতম এবং ফ্রান্সের একজন জাতীয় সেলিব্রেটি। সামুদ্রিক উইন্ড সার্ফিং প্রতিযোগিতায় তিনি ১৯৮২ সনে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিলেন তিনিই প্রথম ফরাসী হিসেবে উইন্ড সার্ফিং নৌকার সাহায্যে আটলান্টিক সাগর পাড়ি দিয়েছিলেন। ফার্ষ্ট অফিসার জাঁ মার্কো এবং ফ্লাইট ইঞ্জিনিয়ার জিল জার্ডিনাউ কনকর্ড ফ্লাইট পরিচালনায় খুবই দক্ষ ও অভিজ্ঞতা সম্পন্ন।

বিকেল ৩:৫৪: যাত্রীরা লাইন ধরে কনকর্ড বিমানটিতে আরোহণ করে নির্ধারিত আসন গ্রহণ করলেন। বিমানটিতে ২৫টি সারীতে প্রতিটিতে চারটি করে মোট ১০০টি যাত্রী আসন রয়েছে। ১০০ জন যাত্রীর সেবা প্রদানের জন্য কেবিন ক্রু রয়েছে ৬ জন। 

বিকেল ৪:২৫: নির্ধারিত সময়ের প্রায় এক ঘণ্টা পরে ফ্লাইট ৪৫৯০ উড্ডয়নের জন্য    
২৬ আর রানওয়েতে লাইন আপে এসে দাঁড়াল। কনকর্ডের ঠিক আগের সিডিউলে অপেক্ষা করছে কন্টিনেন্টাল এয়ার লাইন্সের একটি ডিসি ১০ বিমান। কন্টিনেন্টাল ফ্লাইটটি যাবে যুক্তরাষ্ট্রের নিউজার্সির নিউওয়ার্ক বিমান বন্দরে।

বিকেল ৪:৩০: কন্টিনেন্টাল এয়ার লাইন্সের ডিসি ১০-৩০ বিমানটি যুক্তরাষ্ট্রের নিউজার্সির নিউওয়ার্ক বিমান বন্দরের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়ে রানওয়ে ত্যাগ করলো।

বিকেল ৪:৩৫: নির্ধারিত সময়ের এক ঘণ্টা পর এয়ার ফ্রান্স ফ্লাইট ৪৫৯০ যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের জন এফ কেনেডি বিমান বন্দরের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেয়ার জন্য রানওয়ে ২৬ আর এর ডিপারচার পয়েন্টে এসে দাঁড়াল। শার্ল দ্যা গল আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরের প্রধান নিয়ন্ত্রণ টাওয়ার থেকে কনকর্ডের এই যাত্রাটি নিয়ন্ত্রণ করছেন এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলার জিল লজলাঁ। লজলাঁ শার্ল দ্যা গল বিমান বন্দরের একজন অভিজ্ঞ এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলার। আজ তার দায়িত্ব ছিল সকালের ফ্লাইটগুলো সামলানোর কিন্তু বিকেলের শিফটের কন্ট্রোলার কোন সমস্যার কাড়নে জিল লজলাঁর সাথে শিফট বদলে নিয়েছে। লজলাঁ কনকর্ডের ক্যাপ্টেন মার্টির সাথে কথা বলে ফ্লাইট ৪৫৯০ কে যাত্রা শুরুর নির্দেশ দিলে কনকর্ড বিমানটি রানওয়ে দিয়ে দৌড় শুরু করল। টাওয়ার থেকে কন্ট্রোলার লজলাঁ বিমানটির উপর নজর রাখছিলেন। কনকর্ড চার হাজার মিটার দৈর্ঘ্যের রানওয়ের অর্ধেক পাড়ি দিতেই এর গতিবেগ হল ঘণ্টায় ৩২০ কিলোমিটার। এই গতি অর্জনকে বলা হয়ে থাকে পয়েন্ট অব নো রিটার্ন অর্থাৎ এই গতিতে চলন্ত একটি বিমানের পাইলট শুধু একটি কাজই করতে পারেন আর তা হল বিমানটিকে আকাশে তোলা। কনকর্ডের গতিবেগ ৩২০ কিলোমিটার অতিক্রম করতেই কন্ট্রোলার লজলাঁ লক্ষ্য করলেন বিমানটির ডান পাখার নীচ থেকে ধোঁয়া এবং আগুন বেড়িয়ে আসছে। সাথে সাথে তিনি ক্যাপ্টেন মার্টির সাথে রেডিওতে যোগাযোগ করে আগুনের কথা জানালেন। এই সময় কনকর্ডের গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় ৩২৮ কিলোমিটার। ক্যাপ্টেন মার্টি আগুন দেখতে না পেলেও দুটি ইঞ্জিনের শক্তি হঠাৎ করে কমে যাওয়ার বিষয়টি বুঝতে পারছিলেন। কিন্তু এ সময় ক্যাপ্টেন মার্টির কিছুই করার ছিল না।

বিকেল ৪:৪৩:১৫: ক্যাপ্টেন মার্টি কন্ট্রোল কলামটি নিজের দিকে টেনে নিতেই কনকর্ড মাথা উঁচু করে আকাশে উঠে গেল। ডান দিকের বিশাল ডানার নীচে তখন প্রচণ্ড আগুন জ্বলছিল এবং পেছনে আগুন ও ধোঁয়ার বিশাল স্তম্ভ নিয়ে বিমানটি উপরে উঠার চেষ্টা করছিল।

বিকেল ৪:৪৩:৩০: মাটি থেকে মাত্র ৯০ মিটার উপরে উঠা বিমানটিকে নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে ক্যাপ্টেন মার্টি হিমশিম খাচ্ছিলেন। বিমানটি ক্রমশ: বাম দিকে হেলে পরছিল এবং ডান দিকের ইঞ্জিন দুটি বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। ক্যাপ্টেন মার্টি এবং ফার্ষ্ট অফিসার মার্কো বিমানটিকে নিকটবর্তী লে বোর্জ বিমান বন্দরে অবতরণ করানোর চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু ততক্ষণে আগুনের বিস্তার এত বেশী হয়ে পরেছে যে তাঁদের সব চেষ্টাই বিফলে গেল। হঠাৎ করে ডান দিকের ডানাটি বিমান থেকে খুলে নীচে পরে যায়।

বিকেল ৪:৪৫: ডান দিকের ডানার নীচের ইঞ্জিন দুটো সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যেতেই কনকর্ডের গতি কমতে শুরু করে এবং ডানা খুলে যাওয়ার পর মুহূর্তের মধ্যেই বিমানটি খাড়া হয়ে নীচের দিকে পরে যেতে থাকে। ১০ সেকেন্ডের মধ্যে বিমানটি নীচে অবস্থিত লে রেলিস ব্লিউস নামের একটি হোটেল বিল্ডিং এর উপর পরে বিস্ফোরিত হল।

শার্ল দ্যা গল বিমান বন্দরের টাওয়ার থেকে এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলার জিল লজলাঁ দুর্ঘটনাটি পুরোপুরি দেখতে পেলেন। কনকর্ডের মত এত নিরাপদ একটি বিমান এভাবে দুর্ঘটনায় পরতে পারে তা কোনভাবেই বিশ্বাস হচ্ছিল না তাঁর। বলতে গেলে সমগ্র টাওয়ারটিই ক’ মিনিটের জন্য স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল।

ফ্রান্স ও গ্রেট ব্রিটেনের মধ্যে স্বাক্ষরিত একটি চুক্তির আওতায় ফ্রান্সের এরোষ্পেসিয়েল এবং ব্রিটিশ এয়ারক্রাফট কর্পোরেশনের যৌথ উদ্যোগে উৎপাদিত সুপারসনিক ট্রান্সপোর্ট বা এসএসটি কনকর্ড ১৯৬৯ সনে প্রথম আকাশে উড়ে। ১৯৭৬ সনে কনকর্ড বাণিজ্যিক যাত্রী পরিবহন শুরু করে। ১৯৭৬ থেকে ২০০০, এই ২৪ বছরে কনকর্ড এর মাধ্যমে অসংখ্য ফ্লাইট পরিচালিত হয়েছে কিন্তু বড় ধরনের দুর্ঘটনা এই প্রথম ঘটল। দুর্ঘটনার মাধ্যমে কনকর্ড বিমান ধংস হয়ে গেছে, এই সংবাদটি বিশ্বাস করতে অনেকেরেই কষ্ট হয়েছিল। তারপরও বাস্তবতা এই ছিল যে প্যারিসের শার্ল দ্যা গল বিমান বন্দর থেকে উড্ডয়নের দু মিনিটের মধ্যেই এয়ার ফ্রান্স ফ্লাইট ৪৫৯০ দুর্ঘটনায় পরে এবং ১০৯ জন আরোহী সহ কনকর্ড বিমানটি সম্পূর্ণরূপে ধংস হয়ে যায়। প্যারিসের গিনেজ এলাকায় অবস্থিত যে হোটেলটির উপর কনকর্ড বিধ্বস্ত হয় তার ৪ জন কর্মীও একই সাথে নিহত হন।

কনকর্ড বিধ্বস্ত হওয়ার সাথে সাথে উদ্ধার কর্মীরা ছুটে আসে কিন্তু প্রজ্বলিত ধংসাবশেষে প্রচণ্ড তাপের কাড়নে উদ্ধারকাজ বিলম্বিত হয়। উদ্ধার কাজ শেষ হতে প্রায় ৪৮ ঘণ্টা সময় লাগে এবং উদ্ধার সম্পন্ন হওয়ার পর দেখা যায় প্রচণ্ড তাপে মৃতদেহগুলো এমনভাবে বিকৃত হয়েছে যে বিমানের কোন যাত্রী বা ক্রুদের পৃথকভাবে সনাক্ত করা সম্ভব নয়।

প্যারিসের শার্ল দ্যা গল বিমান বন্দরের কাছে কনকর্ডের দুর্ঘটনার পরবর্তীতে ফ্রান্স কর্তৃপক্ষ কনকর্ডের সবগুলো বিমান পরিচালনা স্থগিত ঘোষণা করে এবং ফ্রান্সের এয়ার এক্সিডেন্ট ইনভেস্টিগেশন ব্যুরো এই দুর্ঘটনা তদন্তের দায়িত্ব গ্রহণ করে। 
দ্বিতীয় পর্বে সমাপ্য

Monday, July 1, 2013

মে ডে: দিল্লীর মধ্য আকাশে সংঘর্ষ- ইতিহাসের তৃতীয় ভয়ংকরতম বিমান দুর্ঘটনা-শেষ পর্ব























১২ই নভেম্বর ১৯৯৬ সন্ধ্যা ৭ টা। ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লীর ইন্দিরা গান্ধি আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর এর গ্রাউন্ড এবং এপ্রোচ, উভয় নিয়ন্ত্রণ টাওয়ারেই প্রচণ্ড উত্তেজনা। দিল্লী থেকে ৬৫ কিলোমিটার পশ্চিমে অবস্থিত চরখি দাদ্রি গ্রামের সরিষা ও আলু ক্ষেতে কিছুক্ষণ আগে ভেঙ্গে পরা দুইটি যাত্রীবাহী বিমানের ধংসস্তুপে প্রচণ্ড আগুন জ্বলছে। আকাশের ১৪ হাজার ফিট উপরে বিমান দুটির মধ্যে সংঘর্ষ হয়। সাউদিয়া এয়ার লাইন্সের ফ্লাইট এসভিএ ৭৬৩ দ্বিতল জাম্বোজেট বোয়িং ৭৪৭-১৬৮বি বিমানটির একটি পাখা কাজাখস্থান এয়ার লাইন্সের ফ্লাইট কেজেডএ ১৯০৭ এর টেইল সেকশনের হরাইজন্টাল ষ্ট্যাবিলাইজারে ধাক্কা মারে। ফলে উভয় বিমানই বিস্ফোরিত হয় এবং সাউদিয়ার বোয়িং ৭৪৭ বিমানটি পাক খেতে খেতে ঘণ্টায় প্রায় ১১ শ কিলোমিটার বেগে চরখি দাদ্রি গ্রামের ক্ষেতের উপর আছরে পরে। সংঘর্ষের প্রচণ্ডতায় বোয়িং ৭৪৭ বিমানটির ককপিট মাটির অনেক গভীরে ঢুকে যায়। কাজাখ এয়ার লাইন্সের ইলিউশিন টু ৭৬ টিডি বিমানটি সাউদিয়া বিমানের প্রায় সাত কিলোমিটার দূরে মাটিতে আছরে পরে। সৌদি ও কাজাখ বিমান দুর্ঘটনায় উভয় বিমানের যাত্রী ও ক্রু মিলিয়ে মোট ৩৪৯ জনের মৃত্যু হয়।

বিমান দুর্ঘটনার সংবাদ পাওয়ার সাথে সাথে ভারত সরকারের এয়ার এক্সিডেন্ট ইনভেস্টিগেশন ব্রাঞ্চের তদন্তকারীরা ইন্দিরা গান্ধি আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরের এপ্রোচ কন্ট্রোলে চলে আসেন। প্রাথমিক পর্যায়ে তাঁদের দৃষ্টি রয়েছে এপ্রোচ কন্ট্রোলার বি কে দত্তের দিকে। হয়তো তার কোন ভুলের কারণেই বিমান দুটি একই উচ্চতায় থেকে পরস্পরকে ধাক্কা মেরেছে। তবে সবার আগে বিমান দুর্ঘটনা তদন্তকারীদের যেতে হবে চরখি দাদ্রি গ্রামে যেখানে বিমান দুটো ভেঙ্গে পরেছে। সকাল হতেই ক্যাপ্টেন কেপিএস নায়ারের নের্তৃত্বে এয়ার এক্সিডেন্ট ইনভেস্টিগেশন ব্রাঞ্চের তদন্তকারী দলটি দুর্ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন।  সাউদিয়ার বোয়িং এবং কাজাখ ইলিউশিন বিমান দুটি পরস্পরের ৭ কিলোমিটার দূরত্বে আছরে পরেছে। সুতরাং তদন্তকারীদেরকে দু জায়গাতেই তদন্ত চালাতে হবে। তদন্তের প্রথমেই বিমান দুটির ব্ল্যাক বক্স বা ককপিট ভয়েস রেকর্ডার এবং ফ্লাইট ড্যাটা রেকর্ডার উদ্ধারের জন্য চেষ্টা চলে এবং প্রথম দিনেই বিমান দুটির ধংসস্তুপ থেকে ব্ল্যাক বক্স দুটি উদ্ধার করা হয়। ফ্লাইট ড্যাটা রেকর্ডার থেকে তথ্য সংগ্রহ করা অনেক জটিল ও সময় সাপেক্ষ কাজ বিধায় তদন্তকারীরা প্রথমেই দুটি বিমানের ককপিট ভয়েস রেকর্ডার ও এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলের ট্রান্সক্রিপ্ট পরীক্ষা করার সিদ্ধান্ত নিলেন। ইন্দিরা গান্ধি আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরে বিমান নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রয়োজনীয় সেকেন্ডারি সার্ভিল্যান্স রাডার না থাকায় আকাশে বিমানের অবস্থান জানার জন্য এপ্রোচ কন্ট্রোলাররা বিমানের পাইলট অথবা রেডিও অপারেটরের উপর সম্পূর্ণ ভাবে নির্ভর করেন। অর্থাৎ বিমানের পাইলট যদি জানায় যে বিমানটি ১০ হাজার ফিট উচ্চতায় রয়েছে তবে কন্ট্রোলার এটিকেই বিমানের প্রকৃত উচ্চতা হিসেবে মেনে নেন এবং একটি কাগজে লিখে রাখেন। পাইলট যদি কোন কারণে উচ্চতার হিসাবে ভুল করেন তবে কন্ট্রোলারের তা জানার কথা নয়। ককপিট ভয়েস রেকর্ডারে পাইলট অথবা রেডিও অপারেটরের মধ্যে তথ্য আদান প্রদান এবং ককপিটের ভেতরে ক্রুদের কথোপকথন রেকর্ড হয়। ফ্লাইট ড্যাটা রেকর্ডার বিমান চলার প্রতিটি মুহূর্তে যন্ত্রপাতি কি কাজ করছে, আবহাওয়া কি ধরনের আচরণ করছে এই সব গুরুত্বপূর্ণ তথ্য রেকর্ড করে।

ধংসপ্রাপ্ত বিমান দুটির ককপিট ভয়েস রেকর্ডার হাতে আসার সাথে সাথেই ভারতীয় এয়ার এক্সিডেন্ট ইনভেস্টিগেশন ব্রাঞ্চের তদন্তকারী দলের প্রধান ক্যাপ্টেন কেপিএস নায়ার এপ্রোচ কন্ট্রোলার ভি কে দত্তকে ডেকে পাঠালেন। উদ্দেশ্য, দুর্ঘটনাটির সাথে দত্তের সম্পর্ক কতটুকু তা বিশদভাবে জানা।  যে কোন বিমান দুর্ঘটনার জন্য মূলত: তিনটি কাড়নই মুখ্য থাকে। যেমন:

১। বিমান নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে এপ্রোচ কন্ট্রোলারের কোন ভুল নির্দেশ অথবা ভুল পদক্ষেপ

২। বিমানের ক্রুদের পক্ষ থেকে বিমান পরিচালনায় ভুল

৩। বিমানের কোন যান্ত্রিক ত্রুটি।

তদন্ত দলের কাছে সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে দুর্ঘটনা পূর্ববর্তী এবং দুর্ঘটনার সময়কার উভয় বিমানের পাইলট, রেডিও অপারেটর এবং এপ্রোচ কন্ট্রোলারের মধ্যকার কথোপকথন। তাই তাঁরা দুদিন ধরে এপ্রোচ কন্ট্রোলার ভি কে দত্তের সাক্ষাতকার নিলেন। পরে তার বক্তব্যগুলো দুর্ঘটনা সময়কার এপ্রোচ কন্ট্রোল ম্যানুসস্ক্রিপ্টের সাথে মিলিয়ে দেখা হল।  প্রমাণিত হল যে সাউদিয়া এবং কাজাখ বিমান দুটি নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে ভি কে দত্তের সব পদক্ষেপ সঠিক ছিল এবং তার কোন কাজ অথবা কথা দুর্ঘটনার সাথে কোন ভাবেই জড়িত নয়। ভি কে দত্ত কে রেহাই দিয়ে তদন্তকারীরা ধংসপ্রাপ্ত বিমান দুটির উদ্ধার করা যন্ত্রাংশগুলো পরীক্ষা করা শুরু করলেন। ইতোমধ্যে ধংসাবশেষ থেকে বিমান দুটির আল্টিমেটার উদ্ধার করা হয়েছে। আল্টিমেটার উড়ন্ত অবস্থায় বিমানের উচ্চতা পরিমাপ করে। পরীক্ষার মাধ্যমে একটি বিস্ময়কর তথ্য বেড় হয়ে এলো। সাউদিয়া বিমানটির আল্টিমিটারে দেখা যাচ্ছে সংঘর্ষের সময় বিমানটি ১৪১১০ ফিট উচ্চতায় উড়ছিল এবং কাজাখ বিমানটির উচ্চতা ছিল ১৪১০৮ ফিট। এটি অত্যন্ত বিস্ময়কর তথ্য কারণ ভি কে দত্তের বক্তব্য এবং ফ্লাইট কন্ট্রোল ম্যানুসক্রিপ্ট অনুযায়ী সাউদিয়ার উচ্চতা সঠিক হলেও কাজাখ বিমানটি তার জন্য বেঁধে দেয়া সুনির্দিষ্ট উচ্চতা থেকে প্রায় ১ হাজার ফিট নীচ দিয়ে উড়ছিল।  এমনকি যে কোন কারণে কাজাখ বিমানটি সাউদিয়ার নীচে চলে এসেছিল। পরবর্তীতে ফ্লাইট ড্যাটা রেকর্ডার পরীক্ষা করেও প্রমাণিত হল যে সংঘর্ষের সময় কাজাখ বিমানটি সাউদিয়ার ২ ফিট নীচে ছিল। তদন্তকারীরা অবশেষে দুর্ঘটনার কারণটি বুঝতে পারলেন। এপ্রোচ কন্ট্রোলার ভি কে দত্ত সুস্পষ্টভাবে সাউদিয়া ফ্লাইট এসভিএ ৭৬৩ এর জন্য ১৪ হাজার ফিট উচ্চতা এবং কাজাখ ফ্লাইট ১৯০৭ এর জন্য ১৫ হাজার ফিট নির্দিষ্ট করে দিয়েছিল। সুতরাং এপ্রোচ কন্ট্রোলের ধারনা ছিল কাজাখ ফ্লাইট ও সাউদিয়া পরস্পরকে অতিক্রম কালে দুটি বিমানের মধ্যে প্রায় ১ হাজার ফিট দূরত্ব থাকবে।  কিন্তু কোন অজানা কারণে কাজাখ ফ্লাইটটি তার জন্য নির্দিষ্ট ১৫ হাজার ফিট উচ্চতা থেকে নেমে ১৪ হাজার ফিটে চলে আসে এবং একই উচ্চতায় উড়ন্ত বোয়িং ৭৪৭ বিমানটির সাথে ধাক্কা খায়।

দুর্ঘটনার মূল রহস্যটি উদ্ঘাটিত হলেও কাজাখ ফ্লাইটের পাইলট কি কারণে বরাদ্দ উচ্চতা থেকে ১ হাজার ফিট নীচে চলে এসেছিল সে বিষয়ে জানতে তদন্তকারীরা পুনরায় ককপিট ভয়েস রেকর্ডারের শরণাপন্ন হলেন। প্রথম থেকেই সাউদিয়ার বোয়িং ৭৪৭-১৬৮বি এবং কাজাখ এয়ারের ইলিউশিন ৭৬ বিমান দুইটির সাথে এপ্রোচ কন্ট্রোলের কথোপকথন পুনরায় শোনা হল:

সাউদিয়া ৭৬৩;-  লেভেল ১৪০ (১৪ হাজার ফিট) এ পৌঁছে যাচ্ছি।  আরও উপরে  উঠার অনুমতি চাইছি।

এপ্রোচ কন্ট্রোল;- লেভেল ১৪০ তে স্থির থেকে এগিয়ে যান।

সাউদিয়া ৭৬৩;- লেভেল ১৪০ এ থাকছি।

এপ্রোচ কন্ট্রোলার ভি কে দত্ত চাচ্ছিলেন সাউদিয়া ফ্লাইটটিকে ১৪০ লেভেল অর্থাৎ ১৪ হাজার ফিট উচ্চতায় রেখে বিপরীত দিক থেকে আগত কাজাখ ফ্লাইটটিকে ১৫০ লেভেল অর্থাৎ ১৫ হাজার ফিট দিয়ে অতিক্রম করাতে। দত্তের এই পদক্ষেপ অত্যন্ত সঠিক ছিল।

তদন্তকারীরা এবার মনোযোগ দিলেন কাজাখ ফ্লাইটের সাথে দত্তের কথোপকথনের উপর। যুক্তরাষ্ট্রের বোয়িং অথবা ইউরোপের এয়ারবাস কর্তৃক তৈরি বিমানগুলোতে ক্যাপ্টেন অথবা ফার্ষ্ট অফিসার এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলের সাথে সরাসরি রেডিও যোগাযোগ করে। কিন্তু রাশিয়ার যাত্রীবাহী বিমানগুলো প্রথমত মিলিটারী ব্যবহারের জন্য তৈরি করা হয়েছিল। পরে এই বিশালাকায় বিমানগুলো দিয়ে রাশিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন দেশগুলো বাণিজ্যিকভাবে যাত্রী পরিবহন শুরু করলেও এগুলোর ককপিটের কোন পরিবর্তন করা হয় নি। ফলে ইলিউশিন জাতীয় বিমানগুলোতে রেডিও যোগাযোগের দায়িত্ব থাকে রেডিও অপারেটরের উপর। আর রেডিও অপারেটরের বসার যায়গা থাকে ফার্ষ্ট অফিসারের পেছনে  যেখানে কোন উচ্চতা মাপক আল্টিমেটার থাকে না। ফলে বিমানের উচ্চতা বুঝতে হলে রেডিও অপারেটরকে পাইলট অথবা ফার্ষ্ট অফিসারের সম্মুখে অবস্থিত আল্টিমিটারের দিকে কষ্ট করে তাকাতে হয়। এ ছাড়া সাবেক রাশিয়ান দেশগুলোর বাণিজ্যিক বিমান সংস্থার বেশীর ভাগ ক্রুরা ইংরেজি জানে না ফলে সম্পূর্ণ যোগাযোগের দায়িত্ব থাকে রেডিও অপারেটরের উপর। অর্থাৎ পাইলট এবং এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলাররা তথ্য বিনিময় করে থাকে রেডিও অপারেটরদের মাধ্যমে। কাজাখ ফ্লাইট ১৯০৭ এর ক্ষেত্রেও রেডিও যোগাযোগের দায়িত্ব ছিল রেডিও অপারেটর আইগর রেপ এর উপর।

আইগর রেপ: কাজাখ ১৯০৭ থেকে বলছি। আমরা ১৫০ লেভেল এ পৌঁছে গেছি। পরবর্তী নির্দেশের জন্য অপেক্ষায় আছি।

এপ্রোচ কন্ট্রোল: ১৫০ লেভেলে স্থির থেকে এগিয়ে আসুন তবে বিপরীত থেকে সৌদি বোয়িং ৭৪৭ আপনাদের দিকে এগিয়ে আসছে। এই মুহূর্তে বিমানটি আপনাদের থেকে দশ মাইল দূরে আছে। লক্ষ্য রাখুন এবং বিমানটি দেখা মাত্রই আমাকে জানান।

আইগর রেপ: ১৫০ লেভেলে স্থির থেকে এগিয়ে আসছি। সৌদি বিমানটি কত মাইলের মধ্যে আছে?

এপ্রোচ কন্ট্রোল: সৌদি বিমান এই মুহূর্তে আট মাইলের মধ্যে আছে। লক্ষ্য রাখুন।

দশ সেকেন্ড পর এপ্রোচ কন্ট্রোলার দত্ত পুনরায় কাজাখ বিমানটির সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করলো কিন্তু কোন জবাব পেল না। দত্ত সাউদিয়া ফ্লাইটের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করেও ব্যর্থ হল। ঠিক এই সময়েই লকহীড সি-১৪১বি ষ্টারলিফ্টার বিমানটির ক্যাপ্টেন টিমোথী জে প্লেস এপ্রোচ কন্ট্রোলকে বিস্ফোরণের বিষয়টি জানালেন।
তদন্তকারীরা নিশ্চিত হলেন যে কোন এক অজানা কারণে কাজাখ বিমানটি এপ্রোচ কন্ট্রোল থেকে বরাদ্দ করা ১৫০ লেভেল থেকে ১৪০ লেভেলে নেমে এসেছিল কিন্তু রেডিও অপারেটর আইগর রেপ বিষয়টি বুঝতে পারে নি বিধায় সে জানায় যে বিমানটি ১৫ হাজার ফিটে এসে স্থির হয়েছে।

সাউদিয়া এবং কাজাখ বিমানের মুখোমুখি দুর্ঘটনার পর তিন মাস কেটে গেছে। ভারতীয় তদন্তকারীরা এখন নিশ্চিতভাবে দুর্ঘটনার কারণটি জানেন কিন্তু কোন বিমানটি এই দুর্ঘটনার জন্য দায়ী তা বুঝতে হলে নিরপেক্ষভাবে সিভিআর এবং এফডিআর পরীক্ষা করা প্রয়োজন। তাই নিরপেক্ষ বিশ্লেষণের উদ্দেশ্যে দুর্ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধারকৃত যন্ত্র দুটি ইংল্যান্ডে প্রেরণ করা হল। ব্ল্যাক বক্স বিশেষজ্ঞ পিটার শেফার্ড যন্ত্র দুটো থেকে সব ধরনের তথ্য সংগ্রহের দায়িত্ব পেলেন।  বিশ্লেষণের শুরুতেই সাউদিয়া ফ্লাইটের ককপিট ভয়েস রেকর্ডার এবং ফ্লাইট ড্যাটা রেকর্ডারের তথ্য মিলিয়ে দেখে জানা গেল সাউদিয়ার পাইলট এবং কো-পাইলট সব ধরনের নিয়ম মেনে এপ্রোচ কন্ট্রোলের নির্দেশে ১৪ হাজার ফিট উচ্চতায় এসে বিমানটিকে স্থির করে ঘণ্টায় প্রায় ৮ শ কিলোমিটার বেগে এগিয়ে যেতে থাকেন। এ থেকে প্রমাণ হয় যে দুর্ঘটনার জন্য সাউদিয়ার বিমানটি কোনভাবেই দায়ী নয়। এবার কাজাখ ফ্লাইটের ব্ল্যাক বক্স বিশ্লেষণের মাধ্যমে একটি গুরুতর অসঙ্গতি পেলেন পিটার শেফার্ড। দেখা গেল, কাজাখ ফ্লাইটের রেডিও অপারেটর যখন জানায় যে তার বিমান ১৫ হাজার ফিট উচ্চতায় নেমে এসেছে তখন প্রকৃত পক্ষে উচ্চতা ছিল ১৪৫০০ ফিট এবং এপ্রোচ কন্ট্রোলের ১৫ হাজার ফিটে স্থির হওয়ার নির্দেশ অমান্য করে বিমানটি আরও নামতে থাকে এবং এক পর্যায়ে বিমানটি ১৪ হাজার ফিটে চলে আসে কিন্তু হঠাৎ করে পাইলট বিমানের গতি বাড়িয়ে উপরের দিকে উঠার চেষ্টা করলেই সাউদিয়ার বিমানটির সাথে সংঘর্ষ হয়। ফ্লাইট বক্স বিশ্লেষণ করে তদন্ত দল দুর্ঘটনার বিষয়ে বিষদ জানতে পারেন।

কি ভাবে দুর্ঘটনাটি ঘটল?

সন্ধ্যা ৬:৩২ মিনিট। গ্রাউন্ড কন্ট্রোলের অনুমতি পেয়েই সাউদিয়া ফ্লাইট এসভি ৭৬৩ রানওয়ে ত্যাগ করে আকাশে উঠে গেলে এপ্রোচ কন্ট্রোলার ভি কে দত্ত এর নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব গ্রহণ করে। এ সময় তার নিয়ন্ত্রণে থাকা পাঁচটি ফ্লাইটের মধ্যে তিনটি ছিল অগ্রধীকারপ্রাপ্ত। দুটি বিমান অবতরণের জন্য আসছিল এবং একটি বিমান বন্দর ত্যাগ করে উপরের দিকে যাচ্ছিল।  

সন্ধ্যে ৬:৩৯ মিনিট। সাউদিয়া ৭৬৩ এর কমান্ডার ক্যাপ্টেন খালিদ এপ্রোচ কন্ট্রোলকে জানালেন যে তিনি প্রত্যাশিত ১৪ হাজার ফিটে পৌঁছে গেছেন এবং আরও উপরে উঠার অনুমতি চাইছেন। বি কে দত্ত ক্যাপ্টেন খালিদকে ১৪ হাজার ফিট উচ্চতা বজায় রাখার নির্দেশ দিল।

সন্ধ্যে ৬:৪০ মিনিট। কাজাখ ফ্লাইট ১৯০৭ থেকে রেডিও কন্ট্রোলার আইগর রেপ এপ্রোচ কন্ট্রোলকে জানালেন যে তিনি তাঁর জন্য নির্ধারিত ১৫ হাজার ফিট উচ্চতায় নেমে এসেছেন। কিন্তু এই সময় কাজাখ ফ্লাইটের উচ্চতা ছিল ১৪৫০০ ফিট। এপ্রোচ কন্ট্রোলার আইগর রেপকে ১৫ হাজার ফিট উচ্চতায় স্থির হওয়ার নির্দেশ দিয়ে বিপরীত দিক থেকে আগত সাউদিয়া ফ্লাইট সম্বন্ধে জানাল।

সন্ধ্যে ৬:৪০:১০ সেকেন্ড: সাউদিয়া ফ্লাইট ৭৬৩ উড়ছে ১৪১১০ ফিট উচ্চতায় আর কাজাখ ফ্লাইট নেমে এসেছে ১৪১০০ ফিটে। রেডিও অপারেটর এই সময় উচ্চতা জনিত ভুলটি বুঝতে পেরে পাইলটকে ১৫ হাজার ফিটে উঠে যাওয়ার পরামর্শ দিলে ক্যাপ্টেন গেন্নাদী ইঞ্জিনের শক্তি বৃদ্ধি করে উপরে উঠার চেষ্টা করলেন।

সন্ধ্যে ৬:৪০:১১ সেকেন্ড: কাজাখ ফ্লাইট ১৪১০৮ ফিটে আসতেই বিপরীত দিক থেকে আসা সাউদিয়া বিমানের বা দিকের ডানার সাথে কাজাখ বিমানের টেইল সেকশনের হরাইজন্টাল ষ্ট্যাবিলাইজারের ধাক্কা লাগল। সাথে সাথে সাউদিয়ার বা দিকের ডানা বিস্ফোরিত হয়ে আগুন ধরে গেল এবং বিমানটি পাক খেতে খেতে ঘণ্টায় প্রায় ১১ শ কিলোমিটার বেগে মাটিতে আছরে পরল। এ সময় মৃত্যু সম্মুখে দেখে ফার্ষ্ট অফিসার নজর খান পবিত্র কলেমা শাহাদাত (আশ্শাহাদু লাইলাহা ইল্লারাহ-) পড়তে থাকেন। সংঘর্ষে কাজাখ ফ্লাইটের হরাইজন্টাল ষ্ট্যাবিলাইজার ভেঙ্গে গেলে বিমানটি কিছুদূর এগিয়ে সাউদিয়া বিমান থেকে প্রায় সাত কিলোমিটার দূরে মাটিতে আছরে পরে ধংস হয়ে যায়।

দুর্ঘটনার প্রায় পাঁচ মাস পর তদন্ত রিপোর্টটি প্রকাশিত হয়। এতে কাজাখ ফ্লাইটের ক্যাপ্টেন গেন্নাদী এবং রেডিও অপারেটর রেপকে সম্পূর্ণভাবে দায়ী করা হয় দুর্ঘটনাটির জন্য। রিপোর্টে জানানো হয় যে এপ্রোচ কন্ট্রোলের সুনির্দিষ্ট নির্দেশ থাকা সত্বেও কাজাখ ফ্লাইটটি ১৫ হাজার ফিট থেকে ১৪ হাজার ফিটে নেমে আসার কারণেই দুর্ঘটনাটি ঘটে। এপ্রোচ কন্ট্রোলের নির্দেশ অমান্য করে কাজাখ ফ্লাইটের নীচে চলে আসাকে একটি বোঝার ভুল হিসেবে চিন্হিত করে কাজাখ ক্যাপ্টেন এবং রেডিও অপারেটরের দুর্বল ইংরেজি ভাষা জ্ঞান ও ইলিউশিন বিমানটির অনুপযুক্ত রেডিও কমিউনিকেশন ব্যবস্থাকে দায়ী করা হয়। এ ছারা, দুর্ভাগ্যের বিষয়েও কিছুটা আলোকপাত করা হয় রিপোর্টে। কাজাখ বিমানটি নীচে নামতে নামতে এক পর্যায়ে সাউদিয়া বিমানের ১০ ফিট নীচে চলে আসে। যদি ক্যাপ্টেন গেন্নাদী তাঁর নীচে নামার এই প্রবণতা অব্যাহত রাখতেন তাহলে সাউদিয়া বিমানটি নিরাপদ উচ্চতা দিয়ে কাজাখ বিমানটিকে অতিক্রম করত বিধায় দুর্ঘটনাটি এড়ানো যেত। কিন্তু একেবারে শেষ মুহূর্তে রেডিও অপারেটর নির্ধারিত উচ্চতার নীচে থাকার বিষয়টি বুঝতে পেরে ক্যাপ্টেনকে উপরে উঠার পরামর্শ দিলে তিনি উপরে উঠার চেষ্টা করেন ফলে এই দুর্ঘটনাটি ঘটে।কিন্তু কাজাখ বিমানের ক্যাপ্টেন নির্ধারিত ১৫ হাজার ফিট থেকে কেন ১৪ হাজার ফিটে নেমে এলেন এই বিষয়টি বোঝাই ছিল সবচাইতে কঠিন। তদন্তকারীরা ধারনা করলেন হয় কাজাখ বিমানটির উচ্চতা নিরুপনকারী যন্ত্রের ত্রুটির কারনে ক্যাপ্টেন সঠিক বুঝতে পারেন নি অথবা দূর্বল ইংরেজী জ্ঞানের কারনে রেডিও অপারেটর এপ্রোচ কন্ট্রোলারের নির্দেশ সঠিকভাবে বুঝতে পারে নি। তবে প্রকৃত কারনটি হয়তো কখনও জানা যাবে না।

১৯৯৬ সনের নভেম্বর মাসে সংঘটিত সাউদিয়া-কাজাখ বিমান দুর্ঘটনার পরে ভারতীয় বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ নয়াদিল্লীর ইন্দিরা গান্ধী আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরে সেকেন্ডারি সার্ভিল্যান্স রাডার স্থাপন করে ফলে এপ্রোচ কন্ট্রোলাররা এখন রাডারে বিমানের পরিচিতি, উচ্চতা এবং গতি বিষয়ে তথ্য একই সাথে দেখতে পারেন। দুর্ঘটনার সময় বিমানবন্দরের তিনটি করিডোরের মধ্যে দুটি সামরিক ব্যবহারের জন্য রিজার্ভ রেখে একটি করিডোর বাণিজ্যিক বিমানের জন্য ব্যবহৃত হত। এখন ২টি করিডোর বাণিজ্যিক বিমানের জন্য উন্মুক্ত করা হয়েছে এবং ভারত সরকার প্রতিটি বিমানে টি-ক্যাস বা ট্রাফিক কলিশন এভয়েডেন্স সিষ্টেম যন্ত্র স্থাপন বাধ্যতামূলক করেছে। 
 

Thursday, June 27, 2013

দিল্লীর মধ্য আকাশে সংঘর্ষ- ইতিহাসের তৃতীয় ভয়ংকরতম বিমান দুর্ঘটনা - প্রথম পর্ব























ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লী। ১২ই নভেম্বর ১৯৯৬ সন। প্রায় সন্ধ্যা। দিল্লীতে শীত প্রায় আসি আসি করছে। গ্রীষ্মের প্রচণ্ড গরমের দিনগুলো কেটে গিয়ে প্রকৃতিতে তাই এক স্বস্তিকর আনন্দের আমেজ। ইন্দিরা গান্ধি আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর। ভারতের প্রবেশ দ্বার। ১৯৯০ সনের পূর্ব পর্যন্ত এটি ছিল এয়ার ইন্ডিয়া এবং ইন্ডিয়ান এয়ারলাইন্স, ভারত সরকার নিয়ন্ত্রিত এই দুটো বিমান সংস্থার জন্য নির্ধারিত ছোট একটি বিমান বন্দর। নব্বই সনের পর ভারত সরকার “ওপেন স্কাই” নীতি গ্রহণ করে বেশ কটি দেশের সাথে আন্তর্জাতিক বিমান চলাচল চুক্তি স্বাক্ষর করলে বিমান বন্দরটি অত্যন্ত ব্যস্ত হয়ে উঠে। বিমান চলাচলের পরিমাণ উল্লেখযোগ্য হারে বেড়ে যায়, অনেকগুলো বিদেশী বিমান সংস্থা এই বিমান বন্দরটি ব্যবহার করা শুরু করে। এদের মধ্যে অন্যতম হল সাউদিয়া-সৌদি এরাবিয়ান এয়ারলাইন্স। ভারত থেকে প্রতিনিয়ত হাজার হাজার যাত্রী মধ্যপ্রাচ্যে তাঁদের কর্মস্থলে যাতায়াত করে থাকেন। এই যাত্রীদের বড় একটি অংশ সাউদিয়ার বিমান পরিসেবা গ্রহণ করেন। তবে ইন্দিরা গান্ধি আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরে বিমান চলাচল অনেক বৃদ্ধি পেলেও এর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার কোন পরিবর্তন হয় নি। এই ১৯৯৬ সনেও বিমান বন্দরটি নব্বই পূর্ববর্তী প্রযুক্তি ব্যবহার করেই বিমান চলাচল নিয়ন্ত্রণ করছে। আধুনিক বিমান চলাচল নিয়ন্ত্রনের ক্ষেত্রে সেকেন্ডারী সার্ভিল্যান্স রাডার একান্ত প্রয়োজনীয় একটি ব্যবস্থা। কিন্তু এই ১৯৯৬ সনেও ইন্দিরা গান্ধি আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরের এপ্রোচ কন্ট্রোলারদের নির্ভর করতে হয় প্রাচীন আমলের প্রাইমারী রাডারের উপর।

যে কোন আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরের মতই বিমান চলাচলের জন্য দিল্লী বিমান বন্দরে
দু ধরনের নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা রয়েছে। মাটিতে থাকা অবস্থায় বিমানের নিয়ন্ত্রণ থাকে গ্রাউন্ড কন্ট্রোলের হাতে। বিমান রানওয়ে ত্যাগ করলে অথবা রানওয়েতে অবতরণের পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত নিয়ন্ত্রিত হয় এপ্রোচ কন্ট্রোলের মাধ্যমে।

সন্ধ্যে ৬.১৫ মিনিট। ইন্দিরা গান্ধি আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরের এপ্রোচ কন্ট্রোল। এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলার বি কে দত্ত সবে মাত্র দায়িত্ব গ্রহণ করেছে। এই মুহূর্তে এপ্রোচ কন্ট্রোলের প্রাইমারী রাডারের আওতায় মোট পাঁচটি ফ্লাইট রয়েছে। এর মধ্যে তিনটি হল অগ্রাধীকারপ্রাপ্ত। টারমাকে দাড়িয়ে উড্ডয়ন অনুমতির জন্য অপেক্ষা করছে সাউদিয়া এয়ার লাইন্সের ফ্লাইট এসভিএ ৭৬৩। বিশাল দ্বিতল জাম্বোজেট বোয়িং ৭৪৭-১৬৮বি বিমানটিতে দিল্লী থেকে সৌদি আরবের দাহরান যাবেন মোট ২৮৯ জন যাত্রী। এদের বেশীর ভাগই অর্থাৎ ২১৫ জনই ভারতীয়। ৪০ জন নেপালি এবং অন্যদের মধ্যে একজন বাংলাদেশী সহ পাকিস্তান, যুক্তরাষ্ট্র এবং যুক্তরাজ্যের নাগরিকবৃন্দ রয়েছেন। বিমানটি পরিচালনা করবে ২৩ সদস্যের ক্রুদের একটি চৌকস দল। অপর ফ্লাইট দুটো এই মুহূর্তে আকাশে রয়েছে। কাজাখস্থান এয়ার লাইন্সের ফ্লাইট কেজেডএ ১৯০৭ একটি চার্টার্ড বিমান। কিরঘিজস্তানের একটি কোম্পানি এই বিমানটি ভাড়া করেছে। রাশিয়ায় নির্মিত ইলিউশিন টু ৭৬ টিডি বিমানটিতে রয়েছে ৩৭জন যাত্রী এবং ক্রু। আকাশে উড়ন্ত অগ্রাধীকারপ্রাপ্ত অপর বিমানটি যুক্তরাষ্ট্র বিমান বাহিনীর একটি পরিবহন বিমান। লকহীড সি-১৪১বি ষ্টারলিফ্টার বিমানটি চালাচ্ছেন ক্যাপ্টেন টিমোথী জে প্লেস।  এটি  রয়েছে ২০ হাজার ফিট উপরে।

সন্ধ্যে ৬:৩২ মিনিট। সাউদিয়া ফ্লাইট এসভিএ ৭৬৩ এপ্রোচ কন্ট্রোলের অনুমতি পেয়ে রানওয়ে ত্যাগ করে নয়াদিল্লীর মেঘলা আকাশের দিকে উড়ে গেল। ঠিক একই সময়ে দিল্লী থেকে ১১৯ কিলোমিটার দূরে আকাশের ২০ হাজার ফিট উপর থেকে কাজাখ ফ্লাইট ১৯০৭ এপ্রোচ কন্ট্রোলার বি কে দত্তের কাছে ফ্লাইট লেভেল পরিবর্তনের অনুমতি চাইলে দত্ত কাজাখ ফ্লাইটিকে ১৫ হাজার ফিটে নেমে এসে স্থির হওয়ার জন্য অনুমতি দিল।  একই এয়ার করিডোরে উড়ন্ত সাউদিয়া ফ্লাইট ৭৬৩ এর জন্য নির্ধারিত ফ্লাইট লেভেল হচ্ছে ১৪ হাজার ফিট। সুতরাং ধারনা করা যায় কাজাখ ফ্লাইট ও সাউদিয়া পরস্পরকে অতিক্রম কালে দুটি বিমানের মধ্যে প্রায় ১ হাজার ফিট দূরত্ব থাকবে। সাউদিয়ার বোয়িং ৭৪৭-১৬৮বি পরিচালনা করছেন ক্যাপ্টেন খালিদ আল সুবাইলী, কো-পাইলট হচ্ছেন ফার্ষ্ট অফিসার নজর খান এবং ফ্লাইট ইন্জিনিয়ারের দায়িত্ব পালন করছেন এদ্রীস আরাবীয়া। কাজাখ ফ্লাইটের ক্যাপ্টেন হলেন গেন্নাদী চেরেপেনভ এবং রেডিও অপারেটর হলেন আইগর রেপ। করিডোরে ২০ হাজার ফিট উপরে রয়েছেন ক্যাপ্টেন টিমোথী জে প্লেস। লকহীড সি-১৪১বি ষ্টারলিফ্টার বিমানটি একটি মিলিটারি বিমান হলেও আজ এর নিয়ন্ত্রণ রয়েছে ইন্দিরা গান্ধি আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরের এপ্রোচ কন্ট্রোলার বি কে দত্তের হাতে।

সন্ধ্যে ৬:৩৯ মিনিট। সাউদিয়া ৭৬৩ এর কমান্ডার ক্যাপ্টেন খালিদ এপ্রোচ কন্ট্রোলকে জানালেন যে তিনি প্রত্যাশিত ১৪ হাজার ফিটে পৌঁছে গেছেন এবং আরও উপরে উঠার অনুমতি চাইছেন। বি কে দত্ত ক্যাপ্টেন খালিদকে ১৪ হাজার ফিট উচ্চতা বজায় রাখার নির্দেশ দিল।

সন্ধ্যে ৬:৪০ মিনিট। কাজাখ ফ্লাইট ১৯০৭ থেকে ক্যাপ্টেন গেন্নাদী এপ্রোচ কন্ট্রোলকে জানালেন যে তিনি তাঁর জন্য নির্ধারিত ১৫ হাজার ফিট উচ্চতায় নেমে এসেছেন। বি কে দত্ত গেন্নাদীর উদ্দেশ্যে বলল;

- কাজাখ ফ্লাইট ১৯০৭। ১৫ হাজার ফিটে বিমান স্থীর রাখ। তোমার বিপরীত দিক থেকে সাউদিয়ার বিমান আসছে। বিমানটি একটি বোয়িং ৭৪৭ এবং তোমার ১০ মাইলের মধ্যে রয়েছে।  সম্মুখ দিকে লক্ষ্য রাখ এবং বিমানটি দেখা মাত্র আমাকে জানাও।

কাজাখ ফ্লাইট থেকে কোন প্রত্যুত্তর না পেয়ে দত্ত আবার বলর;

- কাজাখ ফ্লাইট ১৯০৭। জবাব দাও। আমার কথা কি শুনতে পারছ?

- কাজাখ ফ্লাইট ১৯০৭। আমার কথা কি শুনতে পারছ?

কাজাখ ফ্লাইটের সাথে যোগাযোগের জন্য বি কে দত্ত বারবার চেষ্টা করা সত্বেও কোন ধরনের জবাব পাচ্ছিল না। ওদিকে প্রায় ২০ হাজার ফিট উপর দিয়ে লকহীড সি-১৪১বি ষ্টারলিফ্টার বিমানটি উড়ে আসছিল। ক্যাপ্টেন টিমোথী তাঁর বিমানের নীচে ডান দিকে ভাসমান মেঘের দিকে তাকিয়ে ছিলেন। হঠাৎ তাঁর চোখের সম্মুখে কালো মেঘ কমলা রঙে আলোকিত হয়ে উঠে। ক্যাপ্টেন টিমোথী প্রথমে ভাবলেন তাঁর বিমান লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়েছে কিন্তু কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই রংটি মিলিয়ে যেতেই বুঝতে পারলেন যে মেঘের ঠিক নীচেই একটি বিস্ফোরণ ঘটেছে এবং এপ্রোচ কন্ট্রোলের সাথে যোগাযোগ করে তিনি বিস্ফোরণের কথাটি জানালেন। এর মধ্যে বি কে দত্ত উভয় ফ্লাইটের সাথে যোগাযোগের একাধিক চেষ্টা করেও কোন জবাব পায় নি। ক্যাপ্টেন টিমোথী যখন মেঘের নীচে বিস্ফোরণের কথা বলছিলেন তখনও প্রাইমারী রাডারে উভয় বিমানটিকে দেখা যাচ্ছিল। হঠাৎ করেই রাডার থেকে বিমান দুটি অদৃশ্য হয়ে গেলে বিমান দুর্ঘটনার ভয়ংকর সম্ভাবনার কথাটি বি কে দত্তের মনে আঘাত হানলো। পরক্ষনেই ক্যাপ্টেন টিমোথী জানালেন যে তিনি নীচের মাটিতে দুটি প্রজ্বলিত ধংসস্তুপ দেখতে পাচ্ছেন। ইতোমধ্যে এপ্রোচ কন্ট্রোলের অন্যান্য অপারেটররা দুর্ঘটনার বিষয়টি বুঝতে পেরে বি কে দত্তকে কক্ষের বাইরে নিয়ে গেল।

মুহূর্তের মধ্যে বিমান দুর্ঘটনার কথাটি চারিদিকে ছড়িয়ে পরে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানালেন দিল্লীর প্রায় ৬৫ কিলোমিটার পশ্চিমে অবস্থিত চরখি দাদ্রি গ্রামের সরিষা ক্ষেতে দুটি বিমান ভেঙ্গে পরেছে এবং সেখানে এই মুহূর্তে আগুন জ্বলছে। বিমান দুটিতে মোট ৩৪৯ জন যাত্রী ছিল। দুটি বিমানের মধ্যে ১ হাজার ফিট দূরত্ব থাকা সত্বেও কি ভাবে এ ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে এ নিয়ে ব্যাপক প্রশ্নের জন্ম হলেও দুর্ঘটনা পরবর্তী সময়ে প্রধান যে বিষয়টি গুরুত্ব পায় তা হল উদ্ধার কাজ। দুর্ঘটনার কিছুক্ষণের মধ্যেই উদ্ধার কর্মী এবং অগ্নি নির্বাপণ দল চরখি দাদ্রি গ্রামে উপস্থিত হলেন। কিন্তু প্রজ্বলিত বিমান দুইটির আশে পাশে প্রচণ্ড তাপমাত্রার কারণে তাৎক্ষনিক ভাবে উদ্ধার কর্ম পরিচালনা সম্ভবপর না হওয়ায় অগ্নি নির্বাপণ দল আগুন নেভানোর কাজে তৎপর হলেন। কয়েক ঘণ্টা পর আগুনের তীব্রতা কমে এলে উদ্ধার কর্মীরা জীবিত এবং আহত যাত্রীদের খোঁজে তৎপর হলেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই স্পষ্ট হয়ে উঠলো যে সাউদিয়া ফ্লাইট ৭৬৩ এবং কাজাখ ফ্লাইট ১৯০৭ এর যাত্রী এবং ক্রুদের মধ্যে বেশীরভাগই বিমান দ্বয় মাটিতে আছড়ে পরার সাথে সাথে নিহত হয়েছেন। শুধু কাজাখ ফ্লাইটের চারজন যাত্রীকে জীবিত অবস্থায় উদ্ধার করা গেলেও হাসপাতালে নেয়ার আগেই তাঁরা মৃত্যু বরন করেন।

বিমান দুর্ঘটনার পরপরেই এটি একটি আন্তর্জাতিক হেড লাইন নিউজে পরিণত হয়। সমগ্র বিশ্বের টিভি চ্যানেলগুলো এই দুর্ঘটনার সংবাদ বার বার প্রচার করতে থাকে। সমগ্র বিশ্ব জুড়ে একটি প্রশ্ন উচ্চারিত হতে থাকে; বর্তমান আধুনিক প্রযুক্তির যুগে দু দুটি আধুনিক বিমান কি ভাবে পরস্পরকে মুখোমুখি ধাক্কা দিয়ে ধংস হয়ে যেতে পারে? এই প্রশ্নের জবাব খুঁজতে ভারত সরকার ব্যাপক তদন্ত শুরু করে এবং এই তদন্তের দায়িত্ব প্রদান করা হয় এয়ার এক্সিডেন্ট ইনভেস্টিগেশন ব্রাঞ্চ নামক সংস্থাটিকে।

তদন্তকারীদের কারণ খুঁজে করতে হবে যে এপ্রোচ কন্ট্রোল কর্তৃক প্রতিটি বিমানের জন্য সুনির্দিষ্ট এবং ভিন্ন উচ্চতা নির্ধারণ করে দেয়া সত্বেও কি ভাবে দুটি বিমান একই উচ্চতায় এসে পরস্পরকে আঘাত করে ধংস হয়ে যায়।       

দ্বিতীয় পর্বে সমাপ্য

Tuesday, June 25, 2013

জার্মানীর আকাশে মধ্যরাতে সংঘর্ষ- ঝরে গেল ৪৮টি উদীয়মান নক্ষত্র- শেষ পর্ব

 






















জার্মানির আকাশে ৩৬০০০ ফিট উপর দিয়ে উড়ছে বাস্কারিয়ান এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট বিটিসি ২৯৩৭ আর ইতালি থেকে সুইজারল্যান্ডের আকাশে একই উচ্চতায় উড়ে চলেছে আন্তর্জাতিক কুরিয়ার সংস্থা ডিএইচএল এর ফ্লাইট ডিএইচএক্স ৬১১। ঘণ্টায় গড়ে ৯০০ কিলোমিটার বেগে উড়ন্ত এই বিমান দুটি দক্ষিণ জার্মানি ও উত্তর সুইজারল্যান্ড সীমান্তের আকাশে পরস্পরকে অতিক্রম করবে।  বাস্কারিয়ান এয়ারলাইন্স বহন করছে মোট ৬৯ জন যাত্রী যাদের মধ্যে ৪৮ জন শিশু কিশোর। এরা বাস্কারিয়ান প্রজাতন্ত্র নামক দেশটির অত্যন্ত মেধাবী নবীন নাগরিক। ডিএইচএল এর বিমানটি বহন করছিল মধ্যপ্রাচ্য এবং ইটালি থেকে সংগ্রহীত কুরিয়ার সামগ্রী এবং দু’জন পাইলট। এই বিমানটি বাহরাইন থেকে রওয়ানা হয়ে প্রথমে ইটালির বার্গেমো এসে সবশেষে বেলজিয়ামের রাজধানী ব্রাসেলস এ অবতরণ করবে।

রাত ১১:৩৪ মিনিট। সুইস বেসরকারি এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল স্কাইগাইডের জুরিখস্থ নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র। এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলার পিটার নেলসন একাই দু’টি মনিটরে প্রদর্শিত বিমানগুলো নিয়ন্ত্রণ করছে। এই মুহূর্তে পিটারের সম্পূর্ণ মনোযোগ এরোলয়েডে এয়ারওয়েজ ফ্লাইট ১১৩৫ এর উপর। যাত্রীবাহী এই এয়ারবাসটি নিকটবর্তী  ফ্রিডরিকসহাফেন বিমান বন্দরে অবতরণের জন্য পিটারের সহযোগিতা চাচ্ছে। পিটারের সমস্যা হলো, বাস্কারিয়ান এবং ডিএইচএল এর বিমান দুটি প্রদর্শিত হচ্ছে ১ নং মনিটরে এবং এরোলয়েড ফ্লাইটটি দেখা যাচ্ছে ২ নং মনিটরে। দুটি মনিটরের মধ্যে প্রায় এক গজের দূরত্ব। ফলে পিটার যখন ১নং মনিটরে মনোযোগ দিচ্ছিল তখন ২নং মনিটরটি অনিয়ন্ত্রিত থাকছিল। ১নং মনিটর পর্যবেক্ষণ করতে গিয়ে পিটার বুঝতে পারল যে বাস্কারিয়ান ফ্লাইট ২৯৩৭ এবং ডিএইচএল ফ্লাইট ৬১১ একই উচ্চতায় পরস্পরকে লক্ষ্য করে এগিয়ে আসছে। এটি একটি কলিশন কোর্স অর্থাৎ বিমান দুটি একই উচ্চতায় থেকে পরস্পরের বিপরীত দিক থেকে এগিয়ে আসতে থাকলে মুখোমুখি সংঘর্ষ হতে পারে। পিটার বিষয়টি বুঝতে পেরে সাথে সাথে বাস্কারিয়ান ফ্লাইট ২৯৩৭কে এক হাজার ফুট নীচে অর্থাৎ ৩৫০০০ ফিটে নেমে আসার নির্দেশ দিল। একই সময় এরোলয়েড ফ্লাইট ১১৩৫ এর পাইলট পিটারের কাছে অবতরণ নির্দেশিকা চাইলে পিটার এই ফ্লাইটটিকে সরাসরি ফ্রিডরিকসহাফেন বিমান বন্দরের কন্ট্রোলের কাছে হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত নিয়ে ফোন করতে গিয়ে বুঝতে পারল যে বহির্মুখী ফোন লাইনটি কাজ করছে না। ব্যাকআপ ফোনটির সাহায্য নিতে গিয়েও দেখা গেল সেটিও নষ্ট। বাধ্য হয়েই পিটার এরোলয়েড ফ্লাইটের ক্যাপ্টেনকে সরাসরি ফ্রিডরিকসহাফেন বিমান বন্দরের কন্ট্রোলের সাথে যোগাযোগ করে অবতরণ সহায়তা চাওয়ার পরামর্শ দিল। এরই মধ্যে বাস্কারিয়ান ফ্লাইটের টি-ক্যাস যন্ত্রটি ডিএইচএল ফ্লাইটটির উপস্থিতি বুঝতে পেরে কলিশন এলার্ট প্রদান শুরু করেছে। বাস্কারিয়ানের পাইলটরা বুঝতে পারছে যে বড় একটি বিমান একই উচ্চতায় থেকে তাদের দিকে এগিয়ে আসছে। টি-ক্যাস বলছে ক্লাইম্ব অর্থাৎ মুখোমুখি সংঘর্ষ এড়ানোর জন্য উপরে উঠো। কয়েক সেকেন্ড পরে ডিএইচএল ফ্লাইটের টি-ক্যাস কলিশন এলার্ট দিয়ে পাইলটকে ডিসেন্ট অর্থাৎ নীচে নামার নির্দেশ দিল। এ সময় পিটার এরোলয়েড ফ্লাইটের সাথে কথা বলতে থাকায় ডিএইচএল এর টি-ক্যাস এলার্টটি তার কানে যায় নি। ডিএইচএল ফ্লাইটটির ক্যাপ্টেন পল ফিলিপ্স টি-ক্যাস এলার্ট শুনে নিয়ম অনুযায়ী এক হাজার ফিট নীচে নামার জন্য বিমানের নাক নিচু করলেন। কিন্তু বাস্কারিয়ান ফ্লাইটের ক্যাপ্টেন অ্যালেক্সান্ডার গ্রস তাঁর বিমানের টি-ক্যাস যন্ত্রটির উপরে উঠার নির্দেশ অগ্রাহ্য করে স্কাইগাইডের কন্ট্রোলার পিটার নেলসনের সহায়তা চাইলেন। এরোলয়েড ফ্লাইটটিকে ফ্রিডরিকসহাফেন বিমান বন্দরের কন্ট্রোলের সাথে যোগাযোগ করার পরামর্শ দিয়ে পিটার এক নং মনিটরে এসে লক্ষ্য করলো বাস্কারিয়ান ও ডিএইচএল ফ্লাইট দুটি এখনও একই উচ্চতায় রয়েছে, তাই সে বাস্কারিয়ান ফ্লাইটের ক্যাপ্টেনকে অতি দ্রুত নীচে নামার নির্দেশ দিল। বাস্কারিয়ান ফ্লাইটের ককপিটে এই মুহূর্তে একটি জটিল অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। টি-ক্যাস বলছে অতি দ্রুত উপরে উঠতে আর স্কাইগাইড থেকে নীচে নামার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। একদম শেষ মুহূর্তে পাইলটরা স্কাইগাইডের নির্দেশ মান্য করার সিদ্ধান্ত নিয়ে বিমানের নাক নিচু করলো ফলে উভয় বিমান আরও দ্রুত পরস্পরের দিকে এগিয়ে যেতে থাকে। এরোলয়েড ফ্লাইটটি নিয়ে ব্যস্ত থাকায় এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলার পিটার নেলসন জানতেই পারে নি যে টি-ক্যাসের নির্দেশে ডিএইচএল ফ্লাইটটি ইতোমধ্যেই নীচের দিকে নামা শুরু করেছে। এ ধরনের একটি জটিল মুহুর্তে স্কাইগাইডের আকাশ পথে চলাচলকারী বিমানের উপর লক্ষ্য রাখার মূল রাডারটি বন্ধ থাকায় বিমান দুটোর প্রকৃত উচ্চতা বোঝাও পিটারের পক্ষ্যে সম্ভব ছিল না। এর মধ্যে আরেকটি দূর্ভাগ্যজনক ঘটনা ঘটছিল, বিমান বন্দরের আর্লি ওয়ার্নিং সিষ্টেমের দায়ীত্বে থাকা অপারেটর তখন চা পান করার জন্য ক্যাফেটেরিয়াতে গিয়েছিল। ফলে বিমান দুটি সংঘর্ষে লিপ্ত হওয়ার দুই মিনিট আগেই আর্লি ওয়ার্নিং সিষ্টেম কলিশন সংকেত প্রদান করলেও তা শোনার জন্য কেউই ছিল না।   

ঠিক রাত ১১:৩৫:৫২ সেকেন্ডে বাস্কারিয়ান ফ্লাইট ২৯৩৭ এবং ডিএইচএল ফ্লাইট ৬১১ আকাশের ৩৪৮৯০ ফিট উচ্চতায় পরস্পরকে ধাক্কা মারল। সংঘর্ষের প্রচণ্ডতায় বোয়িং ৭৫৭ বিমানটির টেইল সেকশন এর ভার্টিক্যাল ষ্ট্যাবিলাইজার ছুড়ি দিয়ে যে ভাবে কেক কাটে, সেভাবেই টুপোলভ টিইউ ১৫৪ বিমানটিকে কেটে দু’টুকরো করে ফেলে। বিমানের ককপিট সহ নোজ সেকশনটি খুব দ্রুত নীচের দিকে পরে যেতে থাকে আর ইন্জিন সহ টেল সেকশন আরও কয়েক সেকেন্ড উড়ন্ত থেকে তারপর ধীরে ধীরে নীচের দিকে নেমে আসে। ডিএইচএলের বোয়িং ৭৫৭ এর টেল সেকশনের ভার্টিক্যাল ষ্ট্যাবিলাইজারটির প্রায় ৮০% ধংস হয়ে গেলেও বিমানটি আরও ২মিনিট আকাশে ভেসে থেকে প্রায় সাত কিলোমিটার উড়ে গিয়ে টেইসার্সড্রফ নামের একটি গ্রামের জঙ্গলের উপরে টুকরো টুকরো হয়ে ছড়িয়ে পরে। বাস্কারিয়ান ফ্লাইটের ৬৯ জন এবং ডিএইচএলের ২ পাইলট সহ সবাই তাৎক্ষনিক ভাবে প্রাণ হারালেন।

বিমান দুটি সংঘর্ষে লিপ্ত হওয়ার প্রায় সাথে সাথেই পিটার নেলসন বিষয়টি বুঝতে পারে। কিন্তু তখন তার কিছুই করার ছিল না। এটি একটি সত্যিকারের দুর্ভাগ্যজনক বিমান দুর্ঘটনা এবং অনেকগুলো অস্বাভাবিক ঘটনা অনাকাংখিতভাবে এক সাথে ঘটার কারনেই বিমান দুটির ভাগ্য বিপর্যয় ঘটেছিল।

দুর্ঘটনা পর পরই বাহরাইন, রাশিয়া এবং জার্মানির বিমান দুর্ঘটনা তদন্ত সংস্থাগুলো বিভিন্নভাবে তদন্ত করে দুর্ঘটনার কারনগুলো খুঁজে বেড় করে। এতে সবাই একমত হয় যে সুইজারল্যান্ডের বেসরকারি এয়ার ট্রাফিক সংস্থা স্কাইগাইডের দুর্বল ব্যবস্থাপনা ও লোক স্বল্পতাই দুর্ঘটনাটির প্রধান কারন। এ ছাড়া বাস্কারিয়ান ফ্লাইটটির পাইলটদের টি-ক্যাস যন্ত্রের নির্দেশ অমান্য করে নীচের দিকে নামাটিও আরেকটি প্রধান কারন।

দুর্ঘটনার পরে পিটার নেলসন চাকুরী ছেড়ে দিয়ে অজ্ঞাতবাসে চলে যায় তবে ২০০৪ সনের ২৪ ফেব্রুয়ারি জুরিখের নিকটবর্তী ক্লোটেন নামক স্থানে রাশিয়ান স্থপতি ভিটালী কলোয়েভ এর ছুরিকাঘাতে নিহত হয়। বিমান দুর্ঘটনায় তাঁর পরিবারের সকল সদস্যের মৃত্যুর জন্য ভিটালী পিটারকে দায়ী মনে করতেন। এই হত্যাকাণ্ডের জন্য ভিটালীকে কারাদণ্ড দেয়া হলেও তাঁর মানসিক অবস্থার কথা বিবেচনায় এনে ২০০৭ সনে তাঁকে মুক্তি দেয়া হয়।

বাস্কারিয়ান ফ্লাইট ২৯৩৭ এবং ডিএইচএল ফ্লাইট ৬১১ এর মুখোমুখি সংঘর্ষের ফলে নিহতদের স্মরণে জার্মান সরকার ইউবারলিনজেন গ্রামে একটি স্মৃতিসৌধ তৈরি করেছে। দুর্ঘটনায় নিহত ৭১ জন অকাল প্রয়াত মানুষের নিকট আত্মীয়রা ছিন্ন হওয়া মুক্তার মালার আকৃতির এই স্মৃতি সৌধটিতে প্রতি বছর ১লা জুলাই তারিখে শোকতপ্ত মনে আসেন দুর্ভাগা মানুষগুলোর স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে। আর নিহত ৪৮ জন মেধাবী শিশু কিশোরদের মাতৃভূমি বাস্কারিস্থানের মানুষরা প্রতি বছর এই দিনে অনেক শ্নেহ আর ভালবাসার সাথে স্মরণ করেন তাঁদের অকালে হাড়িয়ে যাওয়া সন্তানদের।

Wednesday, June 12, 2013

জার্মানীর আকাশে মধ্যরাতে সংঘর্ষ- ঝরে গেল ৪৮টি উদীয়মান নক্ষত্র- প্রথম পর্ব




২৮শে জুন ২০০২। সাবেক সোভিয়েট ইউনিয়নের অংশ এবং বর্তমানে প্রজাতন্ত্র বাশকারিস্থানের রাজধানী উফার কেন্দ্রীয় ট্রেন ষ্টেশন। আজ সকাল থেকেই এখানে উৎসব ভাব। বাবা, মা, ভাই, বোন সহ একে একে উপস্থিত হচ্ছে উফার ক্ষুদে নক্ষত্ররা। ইউনেস্কোর আমন্ত্রনে উফার ৪৮ জন মেধাবী শিশু কিশোর আজ মস্কো হয়ে স্পেনের অবকাশ কেন্দ্র বার্সেলোনা যাবে। ক’জন শিক্ষক শিক্ষিকার সাথে এই শিশুরা ট্রেনে করে প্রথমে রাশিয়ান ফেডারেশনের রাজধানী মস্কো যাবে। সেখান থেকে ১১ ঘন্টা বিমান ভ্রমন শেষে বোর্সেলোনা পৌছে দু সপ্তাহের ছুটি কাটাবে। তারপর আবার ফিরে আসবে তাদের একান্ত আপন উফায়। এই সব শিশুদের কেউ ছবি আকে, কেউ অত্যন্ত নামকরা ক্রিড়াবীদ। এদের প্রতিভায় মূগ্ধ হয়ে জাতিসংঘের শিক্ষা ও সাংস্কৃতি বিষয়ক সংস্থা ইউনেস্কো বার্সেলোনায় এই অবকাশের আয়োজন করেছে। ঠিক কাটায় কাটায় সকাল এগারোটায় মস্কোর উদ্দেশ্যে ট্রেন ছাড়লো। ক্ষুদে প্রতিভাদের সাথে দুই শিশু সহ একজন অতিথিও আছেন। তিনি হলেন লুদমিলা কলোয়েভ, উফার বিখ্যাত স্থপতি ভিটালী কলোয়েভের স্ত্রী। ভিটালী বিশেষ কাজে বার্সেলোনার কাছেই এক স্থানে আছেন তাই দুই সন্তান নিয়ে লুদমিলা উফার বিশিষ্ট শিশুদের সাথে বার্সেলোনা যাচ্ছেন স্বামীর সাথে ছুটি কাটাতে।
 
চার ঘন্টা পরে ট্রেন মস্কো পৌছলে ষ্টেশনে অপেক্ষারত ট্যুরিষ্ট এজেন্ট সবাইকে দুটি বাসে করে মস্কোর এক প্রান্তের শেরমেতিয়েভো বিমান বন্দরে নিয়ে এল। এজেন্টের ধারনা ছিল বার্সেলোনাগামী বিমানটি এখান থেকে ছাড়বে। কিন্তু সবাইকে নিয়ে বিমানবন্দরে ঢোকার পর জানা গেল বার্সেলোনাগামী বিমানের জন্য নির্ধারিত বিমানবন্দর হলো দোমোদেদোভো যেটি মস্কোর আরেক প্রান্তে অবস্থিত। ভূলটি জানার পর ট্র্যাভেল এজেন্ট তা সংশোধনের আপ্রাণ চেষ্টা করলেও কোন হল না। শিশুরা তাদের জন্য নির্ধারিত বার্সেলোনাগামী বিমানটিতে উঠতে ব্যার্থ হলেও তারা যাতে মন খারাপ না করে সে জন্য ট্যুরিষ্ট এজেন্সীটি মস্কোতেই তাদেরকে বিভিন্ন দর্শনীয় জায়গা পরিদর্শনের ব্যবস্থা করলো। একই সাথে নতুন আরেকটি বিমান চার্টারের চেষ্টা চললো। দু’দিন পর, অর্থাৎ ১লা জুন ২০০২, বাস্কারিয়ান এয়ারলাইন্সের একটি বিমান চার্টার করা সম্ভব হ’ল।
 
১লা জুলাই ২০০২, রাত ১০:৪৫, মস্কো দোমোদেদোভো আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর। রানওয়েতে এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলের অনুমতির জন্য অপেক্ষা করছে বাম্কারিয়ান এয়ার লাইন্সের ফ্লাইট ২৯৩৭। এই ফ্লাইটে ব্যবহৃত হবে টুপলভ ১৫৪ বিমান। রাশিয়ায় তৈরী এই বিমান যথেষ্ট নিরাপদ এবং স্বল্প পাল্লার উড়ানের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। আজকের ফ্লাইটে মোট ৫ জন ককপিট ক্রু বিমানটি পরিচালনা করবেন। তবে তিন জন পাইলট মূলত: বিমানটি চালিয়ে নিয়ে যাবেন বার্সেলোনা পর্যন্ত। আজকের ফ্লাইটের ক্যাপ্টেন হলেন আলেক্সান্ডার গ্রস। প্রায় ত্রিশ বছর ধরে তিনি অত্যন্ত দক্ষতার সাথে বিমান চালাচ্ছেন। তাঁর কো-পাইলট হিসেবে আছেন ওলেগ গ্রিগারয়েভ। প্রকৃতপক্ষে ওলেগ হচ্ছেন বাস্কারিয়ান এয়ালাইন্সের প্রধান পাইলট। আজকের ফ্লাইটে তিনি আছেন একজন পর্যবেক্ষক ও মূল্যায়নকারী হিসেবে।  আজ তিনি ক্যাপ্টেন গ্রোসের বিমান চালনা পর্যবেক্ষন করবেন। পেছনের সীটে বসেছেন আজকের ফ্লাইটের মূল কো-পাইলট বা ফার্ষ্ট অফিসার মুরাদ ইক্রিয়ভ। মুরাদও অত্যন্ত দক্ষ একজন পাইলট এবং খুব তারাতারি ক্যাপ্টেন হিসেবে পদন্নোতি ঘটতে যাচ্ছে তার। এছাড়া বিমানে উপস্থিত আছেন একজন দক্ষ নেভিগেটর ও একজন ফ্লাইট ইন্জিনিয়ার।
 
রাত ১১টা বাজার পাঁচ মিনিট আগে দোমোদেদোভো ফ্লাইট কন্ট্রোল অনুমতি দিলে ফ্লাইট ২৯৩৭ স্পেনের বার্সেলোনার উদ্দেশ্যে রানওয়ে ত্যাগ করলো। ককপিট ও কেবিন ক্রু সহ বিমানটির মোট যাত্রী ৬৯। আশা করা যায় মোট চার ঘন্টা চল্লিশ মিনিট উড়ার পর ২রা জুলাই ভোর ১:৩০ এর মধ্যে বিমানটি বার্সেলোনার এল প্র্যাট ডি লোবরিগ্যাট বিমান বন্দরে অবতরন করবে। মস্কোর সাথে বার্সেলোনার সময়ের পার্থক্য -২ ঘন্টা।
 
বাস্কারিয়ান ফ্লাইট ২৯৩৭ দোমোদেদোভো ত্যাগ করার দু ঘন্টা পর অর্থাৎ স্থানীয় সময় রাত ১১:০৬ এ ইটালীর বার্গেমো বিমান বন্দর থেকে একটি বোয়িং ৭৫৭ বিমান বেলজিয়ামের রাজধানী ব্রাসেল্সের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিল। আন্তর্জাতিক ক্যুরিয়ার সংস্থা ডিএইচএল এর হয়ে বিমানটি মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের বিভিন্ন শহর থেকে পণ্য ও ডাক পরিবহন করে। আজকের ফ্লাইটের ক্যাপ্টেন পল ফিলিপ্স ফ্লাইটের প্রথম অংশটি পরিচালনা করবেন এবং ফার্ষ্ট অফিসার ব্র্যান্ড ক্যাম্পিউনি পরিচালনা করবেন দ্বিতীয় অংশ। ইটালী সময় রাত ১১:০৬ মিনিটে ডিএইচএল ফ্লাইট ডিএইচএক্স ৬১১ রানওয়ে ত্যাগ করে ব্রাসেল্সের উদ্দেশ্যে উড়াল দিল। বিমানটি ইটালীর আকাশ থেকে প্রথমে সুইজারল্যান্ডের আকাশে প্রবেশ করবে। তার যাত্রার এই অংশটি নিয়ন্ত্রন করবে সুইস বেসরকারী এয়ার ট্রাফিক নিয়ন্ত্রনকারী সংস্থা স্কাই গাইড। সুইজারল্যান্ডের আকাশ সীমা পাড় হয়ে বিমানটি প্রবেশ করবে জার্মানীর আকাশে এবং তখন নিয়ন্ত্রন গ্রহন করবে জার্মান এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল। বাস্কারিয়ান এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট বিটিসি ২৯৩৭ স্পেনের পথে উড়তে গিয়ে দক্ষিন জার্মানীর আকাশে ডিএইচএল ফ্লাইটটিকে অতিক্রম করবে। তবে দুটি বিমানের এ ধরনের অতিক্রম মোটেও বিপদজনক নয় এমনকি বিমান দুটি একই উচ্চতায় থাকলেও কোন ভয় নেই। ট্যুপোলেভ ১৫৪ এবং বোয়িং ৭৫৭, উভয়ই অত্যন্ত আধুনিক বিমান। দুটোতেই সংঘর্ষ এড়ানোর যন্ত্র টি-ক্যাস সংযুক্ত রয়েছে। আকাশে উড়ন্ত অবস্থায় দুটো বিমান পরষ্পরের খুব কাছাকাছি এসে গেলে টি-ক্যাস বা ট্রাফিক কলিশন এভয়ডেন্স সিষ্টেম বিপদ সংকেত প্রদান করে এবং বিমাদ্বয়ের পাইলটদের এ ধরনের পরিস্থিতিতে করনীয় বিষয়ে পরামর্শ প্রদান করে।  
 
সুইস সময় সন্ধ্যা ৭:৫০। বেসরকারী এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল স্কাইগাইডের জুরিখ কেন্দ্র। স্কাই গাইডের জুরিখস্থ এরিয়া কন্ট্রোল সেন্টার উত্তর সুইজারল্যান্ড ও দক্ষিন জার্মানীর আকাশে বিমানের চলাচল নিয়ন্ত্রন করে। দিনের অতি ব্যাস্ত শীফ্ট সবে মাত্র শেষ হয়েছে। রাতের শীফ্টের এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলার পিটার নেলসন তার দায়ীত্ব বুঝে নিতে এলো। পিটার একজন ভাল কন্ট্রোলার হিসেবে পরিচিত এবং আট বছরের অভিজ্ঞতা তাকে একজন দক্ষ এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলার হিসেবে গড়ে তুলেছে। সুইজারল্যান্ডের আকাশ দিনের বেলা অতি ব্যাস্ত থাকে। তাই দিনের শীফ্টে দুজন কন্ট্রোলার কাজ করে। রাতের শীফ্টে আকাশে বিমানের সংখ্যা কম থাকায় দু’জন কন্ট্রোলার পালাক্রমে কাজ করে। অর্থাৎ আকাশে উড্ডয়নরত বিমান পর্যবেক্ষনকারী রাডার এবং ২টি মনিটরের মাধ্যমে বিমান চলাচল নিয়ন্ত্রনের দায়ীত্ব থাকে একজনের উপর, অপরজন তখন বিশ্রাম নেয়। একজন সহকারী নিয়ে পিটার নেলসন দায়ীত্ব গ্রহন করলে দ্বিতীয় কন্ট্রোলার বিশ্রামে গেল। এখন থেকে পিটার নেলসনকেই পালাক্রমে দুটি মনিটরের উপর দৃষ্টি রাখতে হবে এবং আকাশ পথের বিমানগুলোর পাইলটদের সাথে যোগাযোগ রাখতে হবে। এতে করে পিটারের কাজের চাপ অনেক বেড়ে যাবে। এই নিয়মটি যদিও আন্তর্জাতিক বিমান চলাচল আইনের পরিপন্থি কিন্তু বেসরকারী সুইস স্কাইগাইড এর অপারেটররা দীর্ঘদিন ধরেই এই ব্যবস্থা অনুসরন করে আসছে।
 
রাত ১১:১০। কাজের চাপ কম থাকায় পিটার একাই দুটি মনিটরের মাধ্যমে বিমান চলাচল নিয়ন্ত্রন করছে। দুটি মনিটর এমন দুরত্বে অবস্থিত যে একটির দিকে নজর দিলে অন্যটি দেখা সম্ভব হয় না। তবে আকাশে বিমান চলাচল কম থাকায় কোন সমস্যা হচ্ছে না। এমন সময় নিয়ন্ত্রন কক্ষে দুজন টেকনিশিয়ান প্রবেশ করলো। স্কাইগাইড কর্তৃপক্ষের নির্দেশে তারা বিমান চলাচল পর্যবেক্ষনকারী মূল রাডারে কিছু রক্ষনাবেক্ষন কাজ করবে। এতে করে রাডারের গতি ধীর হয়ে যাওয়ায় পিটারের কাজের চাপ আরও বাড়বে। এছাড়া, দুটি বিমানের দূরত্ব কমে গিয়ে মূখোমূখী সংঘর্ষের সম্ভাবনা দেখা দিলে রাডার থেকে দুমিনিট প্রেরিত বিপদ সংকেতও এ সময় শোনা যাবে না। আধ ঘন্টা পর টেকনিশিয়ানদ্বয় এসে জানালো যে রক্ষনাবেক্ষন কাজের অংশ হিসেবে তারা এবার নিয়ন্ত্রন কক্ষের মূল টেলিফোন লাইনটি বিচ্ছিন্ন করবে। পিটারের প্রচন্ড আপত্তি থাকা সত্বেও টেলিফোন লাইনটি বিচ্ছিন্ন করা হল। এখন থেকে বাইরের লাইনে কথা বলার জন্য পিটারকে বিকল্প ব্যাক আপ টেলিফোন সিষ্টেমের উপর নির্ভর করতে হবে যদিও ব্যাক আপ সিষ্টেমটি প্রায়ই নষ্ট থাকে। ঠিক এই সময় জুরিখ এরিয়া কন্ট্রোল সেন্ট্রাল নিয়ন্ত্রিত আকাশ সীমায় একই সাথে প্রবেশ করলো মোট তিনটি বিমান, দুটি যাত্রীবাহী এবং অপরটি পণ্যবাহী। এরোলয়েডে এয়ারওয়েজ ফ্লাইট ১১৩৫, একটি যাত্রীবাহী এয়ারবাস নিকটবর্তী ফ্রিডরিকসহাফেন বিমান বন্দরে অবতরন করবে, জার্মান এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল কর্তৃক হস্তান্তরিত বাস্কারিয়ান এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট বিটিসি ২৯৩৭ এবং ইটালীরে আকাশ থেকে সুইস আকাশে প্রবেশ করা ডিএইচএল ফ্লাইট ডিএইচএক্স ৬১১। তিনটি বিমানের সাথেই পিটারের যোগাযোগ স্থাপিত হয়েছে। এরোলয়েড ফ্লাইট ফ্রিডরেকসহাফেন বিমান বন্দরে অবতরনে সহায়তা চাইলো। অপরদিকে ডিএইচএল ফ্লাইট ২৬০০০ ফিট থেকে প্রথমে ৩২০০০ ফিট এবং সবশেষে ৩৬০০০ ফিট উচ্চতায় উড়ার অনুমতি চাইলো এবং বাস্কারিয়ান ফ্লাইট ৩৬০০০ ফিট উচ্চতায় থেকে বার্সেলোনার দিকে উড়ে যাওয়ার অনুমতি প্রার্থনা করলো। এই পর্যায়ে ১নং মনিটর থেকে পিটার নিয়ন্ত্রন করবে বাস্কারিয়ান ও ডিএইচএল ফ্লাইট এবং ২নং মনিটর থেকে এরোলয়েড ফ্লাইটের অবতরন নিয়ন্ত্রিত হবে ।   
 
উর্ধাকাশে উড্ডয়নরত দুটি বিমান নিয়ন্ত্রনকালে অপর একটি বিমান অবতরনে সহায়তা করা অত্যন্ত জটিল ও কঠিন কাজ বিধায় পিটার এরোলয়েড ফ্লাইটটিকে ফ্রিডরিকসহাফেন বিমান বন্দরের টাওয়ার কন্ট্রোলের কাছে হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত নিয়ে ফোন করার চেষ্টা ব্যর্থ হলো। মূল টেলিফোন লাইন ইতোমধ্যে রক্ষনাবেক্ষনের জন্য বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে এবং ব্যাক আপ সিষ্টেমটি যথারীতি কাজ করছে না। ফ্রিডরিকসহাফেন টাওয়ার কন্ট্রোলের সাথে যোগাযোগে ব্যর্থ হয়ে পিটার এরোলয়েড ফ্লাইটিকে অবতরনে সহযোগীতা দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে একই সাথে তিনটি কাজ করলো। ডিএইচএল ফ্লাইটিকে ৩৬০০০ ফিট উপরে উঠে যাওয়ার অনুমতি দিল, বাস্কারিয়ান ফ্লাইটটিকে ৩৬০০০ ফিট উচ্চতায় থেকে বার্সেলোনার দিয়ে এগিয়ে যেতে বললো এবং এরোলয়েড ফ্লাইটটিকে ফ্রিডরিকসহাফেন বিমান বন্দরে অবতরনের জন্য লাইন আপে আসার নির্দেশ প্রদান করলো। কেউই বুঝতে পারলো না, পিটারের এই কাজগুলোর কারনে এই মাত্র ধংসের এক মহা বীজ বপন করা হল যার ফলস্রুতিতে ঝরে যাবে ৬৯টি অমূল্য প্রাণ।
 
জার্মানীর আকাশে ৩৬০০০ ফিট উপর দিয়ে উড়ছে বাস্কারিয়ান এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট বিটিসি ২৯৩৭, ইটালী থেকে সুইস আকাশে একই উচ্চতায় উড়ে চলেছে আন্তর্জাতিক ক্যুরিয়ার সংস্থা ডিএইচএল এর ফ্লাইট ডিএইচএক্স ৬১১। ঘন্টায় গড়ে ৯০০ কিলোমিটার বেগে উড়ন্ত এই বিমান দুটি দক্ষিন জার্মানী ও উত্তর সুইজারল্যান্ড সীমান্তের ইউবারলিন্জেন এবং ওইলিন্জেন শহর দুটোর আকাশে পরষ্পরকে অতিক্রম করবে। 

 
দ্বিতীয় পর্বে সমাপ্ত


Saturday, June 8, 2013

আটলান্টিকে হাড়িয়ে গেল এয়ার ফ্রান্স ফ্লাইট এএফ ৪৪৭- শেষ পর্ব

 

১লা  জুন ২০০৯। মধ্য আটলান্টিকের ঝন্জা বিক্ষুদ্ধ আকাশ পথে উড্ডয়নরত অবস্থায় হাড়িয়ে গেছে বিশ্বের বৃহৎ বিমান পরিবহন সংস্থা এয়ার ফ্রান্সের ফ্লাইট এএফ ৪৪৭। অত্যাধুনিক সুপরিসর এয়ারবাস এ ৩৩০-২০০ বিমান যোগে ব্রাজিলের রিও ডি জেনিরো থেকে ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিস যাচ্ছিলেন ২১৬ জন যাত্রী এবং ১২ জন ক্রু। ব্রাজিল সময় ৩১শে মে সন্ধ্যা সাড়ে সাতটায় বিমানটি প্যারিসের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেয়। কোঅর্ডিনেটেড ইউনিভার্সাল টাইম ১লা জুন ভোর ১:৪৮ মিনিটে বিমানটি মধ্য আটলান্টিকের কমিউনিকেশন ডেড জোনে প্রবেশ করে। দু ঘন্টা পর সেনেগালের ডাকার এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলের একজন অপারেটর ফ্লাইট এএফ ৪৪৭ এর সাথে রেডিও যোগাযোগের চেষ্টা করলে জানা যায় যে বিমানটি নিখোঁজ হয়েছে। ফ্লাইট ৪৪৭ এর নিখোঁজ হওয়ার সংবাদে সমগ্র বিশ্বে আলোড়ন সৃষ্টি হয় এবং ব্রাজিল, ফ্রান্স, স্পেন ও যুক্তরাষ্ট্র একসাথে অনুসন্ধান অভিযান শুরু করে। ২রা জুন ২০০৯ অপরান্হে, ব্রাজিলিয় বিমান বাহিনীর একটি এমব্রায়ার বিমান  ফ্লাইট ৪৪৭ এর সর্বশেষ অবস্থানের উপর অনুসন্ধান চালাতে গিয়ে একটি বিমানের কিছু ধংসাবশেষ খুঁজে পায়। ২রা জুন বিকেলে ব্রাজিল সরকার ফ্লাইট এএফ ৪৪৭ এর দুর্ঘটনার সংবাদটি প্রকাশ করে।

ফ্লাইট ৪৪৭ নিখোঁজ হওয়ার পর ১লা জুন সকালে ব্রাজিলিয় বিমান বাহিনীর বেশ ক’টি বিমান অনুসন্ধানে যোগ দেয়। এরই একটি এমব্রায়ার আর ৯৯- এ বিমান ফারনান্দো ডি নরনহো দ্বীপান্চলের প্রায় ৬৫০ কিলোমিটার উত্তর পূর্ব এলাকায় সমূদ্রে ভাসমাণ অবস্থায় একটি বিমানের সামান্য কিছু ধংসাবশেষ খুঁজে পায়। এর মধ্যে ছিল একটি সীট, প্যাকেটকৃত অবস্থায় কয়েকটি লাইফ জ্যাকেট, একটি বয়া ইত্যাদি। ধংসাবশেষ পরীক্ষা করে জানা যায় এগুলো ফ্লাইট ৪৪৭ এরই অংশ।

ফ্লাইট ৪৪৭ নিখোঁজ হওয়ার পর ফ্রান্স সরকার এর রহস্য অনুসন্ধানের দায়ীত্ব দেয় ফ্রান্সের তদন্ত ও বিশ্লেষন ব্যুরো (বিইএ) উপর।  বিইএ’র প্রধান পল লুই আরসলানিয়নের নের্তৃত্বে বিইএ অনতিবিলম্বে তদন্ত শুরু করে।

২রা জুন দুপুরে ফরাসী নৌ বাহিনীর ফ্রীগেট ভেনটোস এবং হেলিকপ্টার বাহী জাহাজ মিষ্ট্রেল আটলান্টিকের সম্ভাব্য দুর্ঘটনাস্থলে ব্যপক তল্লাশী চালানোর জন্য রওয়ানা দেয়। ফরাসী সামুদ্রিক গবেষণা জাহাজ পরকুই পাসও এই অনুসন্ধানে অংশগ্রহন করে। এই জাহাজে সমুদ্রের তলায় অনুসন্ধান উপযোগী দুইটি মিনি সাবমেরিন ছিল। ধারনা করা হচ্ছিল দুর্ঘটনাস্থলে আটলান্টিকের গভিীরতা প্রায় ১৬০০০ ফিট এর মত হবে।

৩রা জুন ব্রাজিলিয় নৌ বাহিনীর পাঁচটি জাহাজ ফ্লাইট ৪৪৭ এর খোঁজে দুর্ঘটনাস্থলে পৌছে। ব্রাজিলিয়ান নৌ বাহিনী ও বিমান বাহিনীর যৌথ অনুসন্ধানের মাধ্যমে  ৬ই জুন  ফ্লাইট ৪৪৭ এর কজন যাত্রীর মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়। এ সময় দুর্ঘটনা কবলিত বিমানের যাত্রীদের ভাসমান মৃতদেহের পাশ থেকে  ল্যাপটপ সহ একটি ব্যাকপ্যাক, একটি ব্রীফ কেস ইত্যাদি উদ্ধার করা হয়।

৭ই জুন অনুসন্ধানকারীরা ধংসপ্রাপ্ত বিমানের ভার্টিক্যাল ষ্ট্যাবিলাইজারটি উদ্ধার করেন। এটি ছিল একটি গুরুত্বপূর্ন উদ্ধার কারন ভার্টিক্যাল ষ্ট্যাবিলাইজার পরীক্ষা করে বিমান দূর্ঘটনা বিষয়ে বিশেষজ্ঞরা কিছুটা ধারনা করতে পারবেন। ১৭ই জুনের মধ্যে ব্রাজিলিয় এবং ফরাসী উদ্ধারকর্মীরা ৫০টি মৃতদেহ এবং ভেঙ্গে পরা বিমানের ৪০০টি ক্ষুদ্র অংশ উদ্ধার করেন। এ সময় বিমানের ক্যাপ্টেন মার্ক দ্যুবোয়া’র মৃতদেহ উদ্ধার করে ব্রাজিলিয় নৌ বাহিনী। ২৫শে জুন ব্রাজিল, ফ্রান্স, স্পেন ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ উদ্যোগে  সুমদ্রের উপর অংশে পরিচালিত উদ্ধার অভিযানের সমাপ্তি ঘোষনা করা হয়। কিন্তু হাড়িয়ে যাওয়া বিমানের ধংসাবশেষের খোঁজে সমদ্রের নীচে উদ্ধার অভিযান অব্যাহত রাখা হয়। এ সময় বিমানের দুইটি ব্ল্যাক বক্স; ফ্লাইট ড্যাটা রেকর্ডার বা এফডিআর এবং ককপিট ভয়েস রেকর্ডার বা সিভিআর উদ্ধারের উপর সবচাইতে বেশী গুরুত্ব প্রদান করা হয়। এই গুরুত্বপূর্ন উদ্ধার কাজ পরিচালনার জন্য ফরাসী নৌ বাহিনী একটি পারমানবিক সাবমেরিন দুর্ঘটনাস্থলে প্রেরন করে।

এফডিআর এবং সিভিআর যে কোন যাত্রীবাহী বিমানের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ন দুইটি যন্ত্রাংশ। এফডিআর বা ফ্লাইট ড্যাটা রেকর্ডার বিমান চলাচল সংক্রান্ত সবধরনের তথ্য সংরক্ষন করে আর ককপিট ভয়েস রেকর্ডার বা সিভিআর বিমানের ককপিটের সমস্ত কথোপকথন যেমন ককপিটে অবস্থিত ক্রুদের মধ্যে কথাবার্তা অথবা ককপিট ক্রুদের সাথে এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলের কথোপকথন ইত্যাদি রেকর্ড করে রাখে। সাধারনত শেষ দুই ঘন্টার কথোপকথনের রেকর্ড থাকে সিভিআরএ। একটি বিমান দুর্ঘটনায় পরলে তদন্তকারীরা এফডিআর ও সিভিআর এর তথ্য সমূহ বিশ্লেষন করে দূর্ঘটনার কারন জানার চেষ্টা করেন। এফডিআর ও সিভিআরকে ব্ল্যাক বক্স বলা হলেও এগুলো উজ্জল কমলা রংএর হয় এবং পানি ও আগুন প্রতিরোধক কেসিংএর ভেতরে থাকে বিধায় দুর্ঘটনার সময় আগুন অথবা পানিতে এগুলো নষ্ট হয় না। এ ছাড়া, ব্ল্যাক বক্সে ইলেকট্রিক সিগন্যাল প্রদানকারী বিকন বসানো থাকে। এই বিকন দূর্ঘটনার পরবর্তী ৩০ দিন সিগন্যাল পাঠায় যাতে উদ্ধার কর্মীরা বিকন অনুসরন করে ব্ল্যাক বক্স দুটোকে খুঁজে পেতে পারে।এমনকি সমুদ্রের ৩ মাইল নীচ থেকে প্রেরিত  বিকন সিগনাল গ্রহন করে ব্ল্যাক বক্সের অবস্থান সনাক্ত করা সম্ভব। কিন্তু ব্ল্যাক বক্স উদ্ধারে ফরাসী এবং ব্রাজিলিয়ান নৌবাহিনীর সব ধরনের প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়। এফডিআর এবং সিভিআর উদ্ধার না হওয়ায় ফ্লাইট ৪৪৭ এর দূর্ঘটনার রহস্যটি অমিমাংসিত রয়ে যায়। তবে জুলাই মাসে ফরাসী অনুসন্ধান দল সমূদ্রের অনেক নীচ থেকে অত্যন্ত দূর্বল একটি বিকন সংকেত পেয়েছে বলে সংবাদ প্রকাশিত হলেও পরবর্তীতে তা অস্বীকার করা হয়।

ইতোমধ্যে ফ্রান্সের তদন্ত ও বিশ্লেষন ব্যুরো (বিইএ) উদ্ধারকৃত বিমানের অংশ পরীক্ষা করে একটি বিষ্ময়কর তথ্য উদ্ঘাটন করে। বিশ্লেষকরা বিমানের কয়েকটি অংশ পরীক্ষা করে জানতে পারেন যে  আকাশ থেকে পতনের সময়  বিমানটি প্রচন্ড বেগে সমূদ্রে নেমে আসে। সাধারনত, যে কোন বিমান দূর্ঘটনার ক্ষেত্রে বিমানটি নোজ ডাইভ দিয়ে মাটিতে বা পানিতে নেমে আসে অর্থাৎ বিমান আকাশ থেকে খাড়াভাবে পরে যায়। কিন্তু ফ্লাইট ৪৪৭ এর ক্ষেত্রে এমনটি হয় নি। বিশ্লেষকরা দেখেন যে বিমানটি একই সাথে প্রচন্ড বেগে সামনের দিকে এগিয়েছে এবং খুব দ্রুত উচ্চতা হাড়িয়ে সমূদ্রে পরে গেছে।  এটি সত্যিই একটি অস্বাভাবিক দূর্ঘটনা। বিইএ’র অনুসন্ধানী দল বিমানটি থেকে প্রেরিত ২৪টি অ্যাকারস বার্তা পরীক্ষা করে জানতে পারে যে সর্বশেষ বার্তায় বিমানের পিটো টিউব এ ত্রুটি বিষয়ে উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ দুর্ঘটনার সময় বিমানের একাধিক পিটোটিউব কাজ করছিল না। পিটো টিউব হচ্ছে বিমানের সম্মুখভাগে অবস্থিত ছিদ্রযুক্ত টিউব আকৃতির যন্ত্র। বিমান চলার সময় ছিদ্র দিয়ে বাতাস প্রবেশ করে গতি নির্দেশক কাটাটিকে ঘুড়িয়ে বিমানের গতিবেগ প্রকাশ করে। পিটো টিউব কাজ না করলে হয়তো বিমানের গতি জানা যাবে না কিন্তু এই ধরনের সমস্যায় দুর্ঘটনা ঘটার কোন সম্ভাবনাই নেই। বিশ্লেষকরা আরও জানতে পারে যে এক পর্যায়ে বিমানের অটো পাইলট বন্ধ হয়ে যায় এবং পাইলটরা বিমানের নিয়ন্ত্রন গ্রহন করেন। প্রাপ্ত তথ্যগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ন হলেও এ থেকে দুর্ঘটনা সম্বন্ধে কোন চুড়ান্ত সিদ্ধান্তে আসা সম্ভব ছিল না।

১লা জুন ২০০৯ দুর্ঘটনা ঘটার পর থেকে মার্চ ২০১১ পর্যন্ত  ফ্রান্স, ব্রাজিল এবং যুক্তরাষ্ট্র সরকারের উদ্যেগে অসংখ্য অনুসন্ধান অভিযান পরিচালিত হয় ফ্লাইট ৪৪৭ এর ধংসাবশেষের খোঁজে এবং সবগুলোই ব্যার্থ হয়। এ সময় আটলান্টিক মহাসাগরের নীচে প্রায় ২২০০০ বর্গ কিলোমিটার এলাকায় অনুসন্ধান চালানো হয়। এই ব্যর্থতার কারনে ফ্রান্স সরকার অনুসন্ধান বন্ধ করে দিতে চাইলেও নিহত যাত্রী ও ক্রুদের আত্নীয় স্বজনের চাপে সরকার ২০১১ এর মার্চ মাসে বেসরকারী সামুদ্রিক উদ্ধার প্রতিষ্ঠান উডস ওসেনোগ্রাফিক ইনষ্টিটিউশনের সহায়তা গ্রহন করে এবং চতুর্থ পর্বের অনুসন্ধান অভিযান শুরু হয়। এপ্রিলের প্রথম থেকে এই ইনষ্টিটিউশন অত্যাধুনিক অটোনোমাস আন্ডারওয়াটার ভেহিক্যালের সহায়তায় সমুদ্রের নীচে ব্যপক অনুসন্ধান চালায় এবং ৩রা এপ্রিল ২০১১ তারিখ সকালে সমুদ্রের ১৩০০০ ফুট নীচে ফ্লাইট ৪৪৭ এর ধংসাবশেষ অবিষ্কার করে। পানির নীচে তোলা ডিজিটাল আলোকচিত্রে দেখা যায় বিমানটি ৬০০ থেকে ২০০০ ফুট জায়গা জুড়ে রয়েছে। এ থেকে ধারনা করা হয় সমূদ্রে তলিয়ে যাওয়ার সময় বিমানটি একেবারে ভেঙ্গে চূর্ন বিচূর্ন হয়ে যায় নি। সুতরাং বোমা বিষ্ফোরন অথবা ঝড়ের কারনে যে বিমানটি ধংস হয় নি এ বিষয়টি ষ্পষ্ট হয়। ফ্রান্স সরকার যুক্তরাষ্ট্রের ফিনিক্স ইন্টারন্যাশনাল নামক সংস্থাটিকে উদ্ধারকর্ম পরিচালনার দায়ীত্ব দেয়। সমূদ্রের নীচ থেকে উদ্ধারকর্ম পরিচালনার ক্ষেত্রে ফিনিক্স অত্যন্ত পারদর্শী এবং এই প্রতিষ্ঠানটিই সমূদ্রের নীচ থেকে টাইটানিক জাহাজ উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করেছিল। ২৬শে এপ্রিল ২০১১ তারিখে ফিনিক্সের কর্মীরা ফ্লাইট ৪৪৭ এর ককপিট ভয়েস রেকর্ডার ও ফ্লাইট ড্যাটা রেকর্ডার উদ্ধার করে প্যারিস প্রেরন করে। একই সাথে বিমানের ধংসাবশেষে থাকা নিহত যাত্রীদের মরদেহও উদ্ধার করা হয়। ফ্লাইট ৪৪৭ এর ২২৮ জন যাত্রী ও ক্রুদের মধ্যে মোট ১০৪ জনের মরদেহ উদ্ধার করা সম্ভব হয়।

বিইএ’র বিশ্লেষকরা ১৬ই মে ২০১১ তারিখের মধ্যে সিভিআর ও এফডিআর ড্যাটা পরীক্ষা শুরু করেন এবং  ২০শে মে’র মধ্যে ফ্লাইট ৪৭৭ এর দূর্ঘটনার রহস্য ভেদ করা সম্ভব হয়। ২৭শে মে ২০১১ তারিখে ফ্রান্সের তদন্ত ও বিশ্লেষন ব্যুরো (বিইএ) এয়ার ফ্রান্স ফ্লাইট এএফ ৪৪৭ এর দূর্ঘটনার পূর্নাঙ্গ প্রাথমিক তদন্ত প্রতিবেদন সরকারীভাবে প্রকাশ করে।

কি ঘটেছিল ফ্লাইট এএফ ৪৪৭ এ?

ক্যাপ্টেন মার্ক দ্যুবোয়া’র কমান্ডে ফ্লাইট ৪৪৭ ব্রাজিল সময় সন্ধ্যা ৭:২৯ এ রানওয়ে ত্যাগ করে আকাশে উঠে আসে। এ সময় বিমানের সেকেন্ড ইন কমান্ড হিসেবে ডান দিকের আসনে বসে ছিলেন ফার্ষ্ট অফিসার পিয়েরে সেড্রিক বুনাঁ। ফার্ষ্ট অফিসার ডেভিট রবার্ট বা ডেভ রব্যা ক্রুদের বিশ্রামস্থলে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। ক্যাপ্টেন মার্ক দ্যুবোয়া  এয়ার ফ্রান্সের একজন অতি মুল্যবান পাইলটদের একজন ছিলেন। তাঁর জীবনের অর্ধেক সময় ধরেই তিনি বিমান চালিয়েছেন। ফার্ষ্ট অফিসার পিয়েরে সেড্রিক বুনাঁও একজন অভিজ্ঞ পাইলট ছিলেন। এয়ারবাস এ ৩৩০ চালানোর ক্ষেত্রে তাঁর এক বৎসরের অভিজ্ঞতা ছিল। ফার্ষ্ট অফিসার ডেভ রব্যা এক বছরের কিছু বেশী সময় ধরে এয়ারবাস এ ৩৩০ পরিচালনা করেছেন। ইউটিসি সময় ভোর ১:৪৮ মিনিটে ব্রাজিলিয়ান এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল ফ্লাইট ৪৪৭ কে আটলান্টিক সেন্টারের সাথে যোগাযোগের নির্দেশ দেয়। দক্ষিন আটলান্টিক মহাসাগরের উপর দিয়ে চলাচলকারী সব ধরনের বাণিজ্যিক বিমান সমূহকে সমূদ্রের উপরে আকাশপথে প্রবেশের আগে আটলান্টিক সেন্টারের সাথে যোগাযোগ করতে হয় কারন পরবর্তী এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলের হাতে সমর্পন করার পূর্ব পর্যন্ত বিমানটি নিয়ন্ত্রন করে আটলান্টিক সেন্টার। ক্যাপ্টেন মার্ক দ্যুবোয়া আটলান্টিক সেন্টারের সাথে যোগাযোগ করে তাঁর অবস্থান জানান। এই সময় তিনি ব্রাজিল আকাশ সীমার সর্বশেষ ওয়েপয়েন্ট ইন্টল অতিক্রম করছিলেন। আটলান্টিক সেন্টার বিমানের উর্ধসীমা ৩৫০০০ ফিট নির্ধারন করে তাঁকে এগিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেয়। ভোর ২:১০ মিনিটে ফ্লাইট ৪৪৭ মধ্য আটলান্টিকের কমিউনিকেশন ডেড জোনে প্রবেশ করলে  বহির্বিশ্বের সাথে যোগাযোগ সম্পূর্নরুপে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।

বিশ্রাম শেষে ফার্ষ্ট অফিসার ডেভিট রবার্ট বা ডেভ রব্যা ককপিটে এলে ক্যাপ্টেন মার্ক দ্যুবোয়া বিশ্রামে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। ক্যাপ্টেন দ্যুবোয়া খুবই ক্লান্ত ছিলেন কারন সন্ধ্যায় ফ্লাইট ৪৪৭ এ উঠার আগে তিনি মাত্র এক ঘন্টা ঘুমুতে পেরেছিলেন। ক্যাপ্টেন মার্ক দ্যুবোয়া বিশ্রামে যাওয়ার পর ক্যাপ্টেনের সীটে ডেভ রব্যা বসলেও বিমানের নিয়ন্ত্রন থাকে অটো পাইলটের হাতে এবং সার্বক্ষনিক মনিটরিং এবং তাৎক্ষনিক সিদ্ধান্ত গ্রহনের ক্ষমতা থাকে ফার্ষ্ট অফিসার বুনাঁর হাতে। এ সময় বিমানটি মধ্য আটলান্টিক মহাসাগরের সবচাইতে ঝন্জাবহুল অন্চল অতিক্রম করছিল। এটি এমন একটি অন্চল যেখানে পৃথিবীর দু’প্রান্ত থেকে প্রবাহিত বাণিজ্য বায়ু মিলিত হয়ে সবচাইতে ভয়ংকর বৈদ্যুতিক ঝড়ের সৃষ্টি করে। এই ভয়ংকর এলাকার আকাশে ক্রমাগত মেঘ তৈরী হতে থাকে এবং ঘন্টায় তিন শ কিলোমিটারেরও অধিক বেগে ঘূর্ণীবায়ূ বয়ে যেতে থাকে। ঘন্টায় ৩১০ মাইল বেগে চলতে চলতে বিমানটি হঠাৎ করেই বরফ ক্রিষ্টাল বোঝাই মেঘের ভেতর প্রবেশ করলে কিছু বরফ গতিবেগ নির্ণয়কারী পিটোটিউবের ভেতর ঢুকে পরায় বাতাসের প্রবাহ বিঘ্নিত হয়ে গতিবেগ প্রদর্শনকারী মনিটর ত্রুটিপূর্ন রিডিং দিতে থাকে। বিমানের অটোপাইলট প্রকৃত গতিবেগ বুঝতে না পেরে একেবারে হঠাৎ করেই বিমানের নিয়ন্ত্রন ছেড়ে দেয়। এয়ারবাস কোম্পানী অনেক আগেই এ ৩৩০ এবং এ ৩৪০ বিমানের পিটোটিউব সমস্যার কথা বিমান সংস্থা সমূহকে জানিয়েছিল এবং পাইলটদের এ বিষয়ে করনীয় সম্পর্কে প্রশিক্ষনও প্রদান করা হয়েছিল। পিটোটিউবে বরফ জমে যে সমস্যা সৃষ্টি হয় তার মেয়াদ হচ্ছে ছাপ্পান্ন সেকেন্ড। এর মধ্যেই পিটোটিউব স্বয়ংক্রিয়ভাবে বরফ গলিয়ে কাজ শুরু করে এবংঅটোপাইলট পুনরায় নিজে থেকে নিয়ন্ত্রন গ্রহন করে। নিয়ম হচ্ছে এই ছাপ্পান্ন  সেকেন্ড যে কোন একজন পাইলট বিমানের নিয়ন্ত্রন গ্রহন করে অটোপাইলট পুনরায় নিয়ন্ত্রন গ্রহন করা পর্যন্ত অপেক্ষা করবে। এ সময় পাইলট বিমানের গতি কিংবা দিক ইত্যাদির কোন ধরনের পরিবর্তন করবে না। কিন্তু, ফ্লাইট ৪৪৭ এর অটোপাইলট নিয়ন্ত্রন ছেড়ে দেয়ার সাথে সাথে ফার্ষ্ট অফিসার বুনাঁ কোন অজানা কারনে  বিমানের নাক উপর দিকে তুলে দেয়। যেহেতু ৩৫ হাজার ফিট উপরে বাতাস অত্যন্ত পাতলা, নাক উপরের দিকে তুলে দেয়ায় বিমানের ডানার নীচ থেকে বাতাস সরে গেলে বিমানের গতিবেগ হ্রাস পায়। বিমানটির গতিবেগ ৩১০ নটিক্যাল মাইল থেকে কমে ২২০ এ চলে আসে ফলে একটি অ্যারোডাইনামিক ষ্টল অবস্থার সৃষ্টি হয় এবং বিমানটি  পরে যেতে থাকে। এ ধরনের অবস্থায় নিয়ম হচ্ছে বিমানের নাকটি নীচু করা যাতে ভেসে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় গতি অর্জন করা যায়। কিন্তু, যথেষ্ট প্রশিক্ষন ও অভিজ্ঞতা থাকা সত্বেও ফার্ষ্ট অফিসার বুনাঁ আরও বেশী করে বিমানটির নাক উপর তুলতে থাকেন ফলে বিমানটি খুব দ্রুত উচ্চতা হাড়ায়। এ পর্যায়ে বিমানটি প্রতি মিনিটে ১২০০০ ফিট উচ্চতা হাড়াতে থাকে। ফার্ষ্ট অফিসার রব্যা বিষয়টি লক্ষ্য করে বিমানের নিয়ন্ত্রন নিজের হাতে নিয়ে নাক নীচু করার চেষ্টা করতে থাকেন কিন্তু একই সাথে ফার্ষ্ট অফিসার বুনাঁ তাঁর ষ্টিয়ারিং ষ্টিকটি ব্যবহার করে বিমানের নাক উচু করার চেষ্টা করতে থাকেন। ফলে বিমান উচ্চতা হাড়িয়ে ২২০ মাইল গতিতে সমূদ্রের বুকে সরাসরি নেমে আসে এবং ছিন্ন বিচ্ছিন্ন হয়ে ১২০০০-১৩০০০ ফিট পানির নীচে তলিয়ে যায়। একেবারে শেষ মুহুর্তে ক্যাপ্টেন দ্যুবোয়া ককপিটে এলেও তাঁর করার কিছু ছিল না। বিমান সমূদ্রে আছড়ে পরার সময় সব যাত্রী ঘুমন্ত অবস্থায় ছিলেন ফলে তাদের অজান্তেই মৃত্যু এসেছে হঠাৎ করে।

২০১২ সনের ৫ই জুলাই ফ্রান্সের তদন্ত ও বিশ্লেষন ব্যুরো (বিইএ) এয়ার ফ্রান্স ফ্লাইট ৪৪৭ দূর্ঘটনার বিষয়ে চুড়ান্ত রিপোর্ট প্রকাশ করে। এতে বিমান দুর্ঘটনা ও যাত্রী এবং ক্রুদের মৃত্যুর জন্য বিমানটির পাইলটদের অদক্ষতা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সিদ্ধান্ত গ্রহনে অপারগতাকে দায়ী করা হয়।

 দূর্ঘটনার ঠিক পরপরেই এয়ার ফ্রান্স তার রিও ডি জেনিরো-প্যারিস ফ্লাইটের কোড এএফ ৪৪৭ থেকে এএফ ৪৪৫ এ পরিবর্তন করে।


মে ডে: পরবর্তী পর্ব- জার্মানীর আকাশে সংঘর্ষ: ঝরে পরলো ৪৮টি উদীয়মান উজ্জল নক্ষত্র
 

Friday, May 31, 2013

আটলান্টিকে হাড়িয়ে গেল এয়ার ফ্রান্স ফ্লাইট এএফ ৪৪৭- প্রথম পর্ব


২০০৯ এর ৩১শে মে। সন্ধ্যা সাতটা বেজে গেছে। ব্রাজিলের রিও ডি জেনিরোর গ্যালিও বিমান বন্দরে  দীর্ঘ উড়ানের জন্য তৈরী হচ্ছে এয়ার ফ্রান্সের রিও - প্যারিস ফ্লাইট ৪৪৭। প্রায় ১০ ঘন্টা ৩৪ মিনিটের এই ফ্লাইটটির জন্য ব্যবহৃত হবে ইউরোপের বিমান নির্মাতা এয়ারবাসের তৈরী এয়ারবাস এ ৩৩০-২০০ সিরিজের বিমান। অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য এবং অত্যাধুনিক এই বিমানটিতে রিও থেকে প্যারিসে যাচ্ছেন মোট ২১৬ জন যাত্রী। বিমানটিতে মোট ক্রু’র সংখ্যা ১২। এদের মধ্যে রয়েছেন একজন ক্যাপ্টেন ৫৮ বৎসর বয়েসী মার্ক দ্যুবোঁ, দুজন ফার্ষ্ট অফিসার ডেভিড রবার্ট এবং পিয়েরে সেড্রিক বোনাঁ। এয়ারবাস ৩৩০ বিমানটি পরিচালনায় দু’জন পাইলটই যথেষ্ট কিন্তু এয়ার ফ্রান্সের নিয়ম হচ্ছে ১০ ঘন্টার বেশী সময় ধরে বিমান পরিচালনা করতে হলে একজন রিজার্ভ পাইলট থাকতে হবে। ডিপারচার গেটে অপেক্ষা সময় সহ ফ্লাইট ৪৪৭ এর মোট পরিচালনা সময় হচ্ছে প্রায় ১৩ ঘন্টা, তাই ৩৭ বৎসর বয়েসী ফার্ষ্ট অফিসার ডেভিড রবার্ট রিজার্ভ পাইলট হিসেবে উপস্থিত আছে। বিমান উড়ার প্রথম ৫/৬ ঘন্টা সে  বিমান ক্রুদের বিশ্রামের জায়গার একটি সীটে বসে বিশ্রাম নেবে এরপর ককপিটে এসে ৫৮ বৎসর বয়েসী ক্যাপ্টেন মার্ক দ্যুবোঁকে বিশ্রামে পাঠাবে। ক্যাপ্টেনের বিশ্রাম শেষে অপর ফার্ষ্ট অফিসার পিয়েরে সেড্রিক বোঁনা বিমান পরিচালনার দায়ীত্ব হস্তান্তর করে বিশ্রামে যাবে। দীর্ঘ সময় ধরে বিমান পরিচালনার যে ধকল তা থেকে পাইলটদের কিছুটা রক্ষা করার জন্য এই বিশ্রামের প্রয়োজন অনেক বেশী। তবে এয়ারবাসের অত্যাধুনিক এই ৩৩০ বিমানটিতে পাইলটদের কাজ অনেকটাই সহজ হয়েছে কারন বিমান উড্ডয়ন পরবর্তী বেশীর ভাগ সময় ধরেই বিমান পরিচালনার দায়ীত্ব থাকে কম্পিউটার নিয়ন্ত্রিত অটো পাইলটের হাতে। অটো পাইলট এক ধরনের যান্ত্রিক ব্যবস্থা যা নিয়ন্ত্রিত হয় অসংখ্য মাইক্রোপ্রসেসর এবং স্যাটেলাইট ভিত্তিক গ্লোবাল পজিশনিং সিষ্টেমের সহায়তায়।

বিমানের যাত্রীদের মধ্যে বেশীরভাগই ফরাসী, ব্রাজিলিয়ান এবং জার্মান। তবে আরও ৩০টি দেশের যাত্রী ফ্লাইট ৪৪৭ যোগে প্যারিস যাচ্ছেন আজ।  বিশ্বের অন্যতম এয়ার লাইন্স এয়ার ফ্রান্স তার নিরাপদ বিমান পরিচালনা রেকর্ডের জন্য সমগ্র বিশ্বেই জনপ্রিয়। এই সংস্থার পাইলট ও কেবিন ক্রুদের সুনাম বিশ্ব জুড়ে। তাই ২১৬ জন যাত্রী বিমানটিতে আসন গ্রহন করেছেন এই বিশ্বাসে যে নির্ধারিত সাড়ে দশ ঘন্টা পরে তাঁরা নিরাপদে প্যারিসের দ্যা গল আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরে অবতরন করবেন।

যাত্রা প্রস্তুতিকালে ফার্ষ্ট অফিসার বোনাঁ এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলের সাথে সার্বক্ষনিক যোগাযোগ রাখছিল। ক্যাপ্টেন দ্যুবোঁ তাঁর আসনে বসতেই বোনাঁ সর্বশেষ আবহাওয়া রিপোর্ট সম্বন্ধে জানালো;

- ক্যাপ্টেন, আমাদের যাত্রাপথে আবহাওয়া খুবই খারাপ। মধ্য আটলান্টিকের উপর প্রচন্ড ইলেকট্রিক ঝড় দেখা যাচ্ছে। এমনকি আমাদের জন্য নির্ধারিত ৩৫০০০ ফিট উপরেও বজ্রপাতের সম্ভাবনা রয়েছে। এর মধ্যে এই করিডোরের অনেক বিমান তাদের ফ্লাইট প্ল্যান পরিবর্তন করে অন্য করিডোর ব্যবহার করছে।

ক্যাপ্টেন দ্যুবোঁ বললেন;

-  মনে হচ্ছে এবারের বিমান পরিচালনা আমাদের সবার জন্যই স্মরণীয় হয়ে থাকবে। তবে চিন্তার কিছুই নেই। আমাদের রয়েছে পৃথিবীর সবচাইতে নিরাপদ বিমান এবং আমরা হচ্ছি সবচেয়ে দক্ষ ক্রু। সুতরাং চলো আমরা রওয়ানা দি।

ব্রাজিল সময় সন্ধ্যা ৭:২০ মিনিট। গ্যালিও বিমান বন্দরের এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলার ফ্লাইট ৪৪৭কে বিমান বন্দর ত্যাগ ও উড্ডয়নের অনুমতি দিলেন।

৭:২৯ মিনিট। এয়াবাস এ ৩৩০-২০০ বিমানটি সাবলীলভাবে বিমান বন্দরের রানওয়ে ত্যাগ করে আকাশে উঠে এল। ব্রাজিলিয়ান এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল বিমানটির জন্য ৩৫০০০ ফিট উচ্চতা বেঁধে দিয়েছে। ব্রাজিলিয়ান এয়ার স্পেস ত্যাগ করা পর্যন্ত বিমানটি প্রথমে ব্রাজিলের আটলান্টিক কন্ট্রোল এবং পরবর্তীতে সেনেগালের ডাকার এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলকে রিপোর্ট করবে। সেনেগালের পর বিমানটি কেপ ভার্দে এয়ার স্পেস হয়ে ফ্রান্স এয়ার স্পেসে প্রবেশ করলে তার দায়ীত্ব নেবে ফ্রান্স এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল। যাত্রা পথের অধিকাংশ সমযই বিমানটি তার নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর সাথে যোগাযোগ রাখবে। তবে মধ্য আটলান্টিকের একটি অংশ কমিউনিকেশন ডেড জোন হওয়ার কারনে প্রায় দু ঘন্টা বিমানটির সাথে বহির্বিশ্বের যোগাযোগ সম্পুর্ন বিচ্ছিন্ন থাকবে। দু ঘন্টা নিশ্চুপ থাকার পর বিমানের কমিউনিকেশন অফিসার সেনেগালের ডাকার এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলকে বিমানটির অবস্থান জানাবে এবং ডাকারের অনুমতি প্রাপ্তি সাপেক্ষে কেপ ভার্দে এয়ার স্পেসের দিকে এগিয়ে যাবে।

ব্রাজিল সময় রাত ৮.৩০ এবং কোঅর্ডিনেটেড ইউনিভার্সাল টাইম  ২২.৩০ মিনিট; ফ্লাইট ৪৪৭ তার জন্য নির্ধারিত ৩৫ হাজার ফিট উপরে উঠে এসেছে। আবহাওয়া প্রচন্ড ঝন্জাবহুল হওয়ায় ক্যাপ্টেন সীট বেল্ট খোলার সংকেত দিলেন না তবে মেইন ও ব্যাক কেবিনের ক্রুরা রাতের খাবার পরিবেশন শুরু করলো। আটলান্টিক মহাসাগরের ৩৫ হাজার উপর দিয়ে বিমানটি প্রায় সারা রাত উড়বে। সুতরাং ভরপেট রাতের খাবারের পর যাত্রীবৃন্দ এমনকি কেবিন ক্রুরাও কিছুটা ঘুমিয়ে নিতে পারবে। তবে দুর্দান্ত আবহাওয়ার কারনে সৃষ্ট টার্বুলেন্স যাত্রীদের জন্য অস্বস্তির কারন হতে পারে।

রাত ২৩:৩০ মিনিট। ক্যাপ্টেন  দ্যুবোঁ অটো পাইলট চালু করলেন। এখন থেকে প্যারিস দ্য গল বিমান বন্দরের বিকন সংকেত বিমান কর্তৃক গ্রহন পর্যন্ত বিমান পরিচালনার সম্পুর্ন দায়ীত্ব এই অটো পাইলটের। দুজন পাইলটের একজন এ সময়ে বিমানের ককপিটে অবস্থিত মনিটরগুলোর দিকে খেয়াল রাখবেন আর অপর জন্য ব্যস্ত থাকবেন যাত্রা পথে অবস্থিত নিয়ন্ত্রন কর্তৃপক্ষের সাখে রেডিও যোগাযোগের মাধ্যমে। রেডিও যোগাযোগ ছাড়াও আরেকটি যোগাযোগ ব্যবস্থা বিমানটিতে সার্বক্ষনিকভাবে কাজ করছিল। এ হচ্ছে অ্যাকারস বা অটোমেটেড কমিউনিকেশন এড্রেসিং অ্যান্ড রিপোর্টিং সিষ্টেম। এটি প্রতি দশ মিনিট পরপর একটি করে বার্তা প্যারিসস্থ এয়ার ফ্রান্স ফ্লাইট কন্ট্রোল সেন্টারে প্রেরন করছিল। এই বার্তার মাধ্যমে এয়ার ফ্রান্স কর্তৃপক্ষ ফ্লাইট ৪৪৭ এর অবস্থান এবং বিমান রক্ষানাবেক্ষন বিষয়ক তথ্য জানাতে পারছিল। অ্যাকারস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ন ও প্রয়োজনীয় একটি ব্যবস্থা কারন উড়ন্ত অবস্থায় বিমানের কোন যন্ত্রাংশ কাজ না করলে বা সমস্যা সৃষ্টি করলে সে সম্বন্ধে অগ্রীম তথ্য অ্যাকারসের মাধ্যমে পাওয়া যায় বিধায় বিমান আকাশে থাকতেই সমস্যা সৃষ্টিকারী যন্ত্রাংশ মেরামত বা বদলে ফেলার ব্যবস্থা গ্রহন করা যায়।

ভোর ১: ৩৫ মিনিট; ক্যাপ্টেন দ্যুবোঁ ব্রাজিলিয়ান এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলকে জানালেন যে তিনি তাঁর ওয়েপয়েন্ট ইনটলে পৌছে গেছেন। ইনটল হচ্ছে ব্রাজিলের উত্তর পূর্ব উপকুলীয় শহর নাটাল থেকে ৫৬৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত একটি ওয়েপয়েন্ট বা আকাশের একটি অবস্থান যেখানে ব্রাজিলের আকাশ সীমা শেষ হয়েছে। ইনটল অতিক্রম করার পর ব্রাজিলিয়ান কন্ট্রোলের নির্দেশে ক্যাপ্টেন আটলান্টিক এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলকে তাঁর অবস্থান ও গতিপথ সংক্রান্ত তথ্য দিলে আটলান্টিক কন্ট্রোল ৩৫ হাজার ফুট উচ্চতা বজায় রেখে নির্ধারিত গন্তব্যের পথে এগিয়ে যাওয়ার অনুমিত দিল।

ভোর ১:৪৮ মিনিট. ফ্লাইট ৪৪৭ ব্রাজিলিয়ান আকাশ সীমা অতিক্রম করে মধ্য আটলান্টিকে কমিউনিকেশন ডেড জোনে প্রবেশ করল ফলে বিমানটি তার উপর লক্ষ্য রাখা সবগুলো রাডার থেকে অদৃশ্য হয়ে গেল। এটি একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। মধ্য আটলান্টিকের এই অংশে কোন ধরনের ইলেকট্রনিক ওয়েভ প্রবেশ করতে পারে না বিধায় সব ধরনের রেডিও যোগাযোগ বন্ধ থাকে ফলে কোন রাডার থেকেই বিমানের উপর লক্ষ্য রাখা সম্ভভ হয় না। ফ্লাইট ৪৪৭ আটলান্টিকের এই অন্চলটি দিয়ে প্রায় দু ঘন্টা কোন রকমের রেডিও যোগাযোগ ছাড়া উড়বে এবং আফ্রিকার সেনেগাল এর আকাশ সীমায় প্রবেশ করার সাথে সাথে ডাকারস্থ এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলের সাথে রেডিও যোগাযোগ স্থাপন করবে। পৃথিবীর দুই প্রান্ত থেকে বয়ে আসা বাণিজ্য বায়ূ মধ্য আটলান্টিকের এই অন্চলটিতে মিলিত হয় ফলে এখানে সবসময় প্রচন্ড বিদ্যুৎবাহী ঝড় বইতে থাকে। বিমান চলাচলের জন্য এই অন্চলটি অত্যন্ত বিপদজনক বিধায় অনেক এয়ার লাইন্স তাদের বিমান অন্য কডিডোর দিয়ে পরিচালনা করে। তবে অত্যাধুনিক এয়ারবাস এ ৩৩০-২০০ এর জন্য এ ধরনের ঝন্জাবহুল আবহাওয়া খুব একটা বিপদজনক নয় কারন এই বিমানটির অ্যারোডায়নামিকস এ ধরনের আবহাওয়ার জন্য উপযোগী এবং দুটি জেনারেল ইলেকট্রিকস ইন্জিন এত শক্তিশালী যে প্রচন্ড ঝড়ের মধ্যেও বিমানটি সাবলীলভাবে উড়তে সক্ষম।

ইউটিসি সময় ভোর ৪.০০টা। ফ্লাইট ৪৪৭ এর রেডিও যোগাযোগের জন্য অপেক্ষারত সেনেগাল এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলের একজন অপারেটর বিমানটির সাথে রেডিও যোগাযোগের চেষ্টা করল;

- এয়ার ফ্রান্স ফ্লাইট এএফ ৪৪৭, ডাকার থেকে বলছি, দয়া করে যোগাযোগ কর।

বেশ কবার রেডিও যোগাযোগের চেষ্টা চালাবার পর বিমানটি থেকে কোন ধরনের সাড়া না পাওয়ায় ডাকার কন্ট্রোল প্যারিসস্থ এয়ার ফ্রান্স এর প্রধান কার্যালয়ে যোগাযোগ করে ফ্লাইট ৪৪৭ এর সাথে যোগাযোগ  ব্যর্থতার তথ্যটি জানাল।

ব্রাজিলের গ্যালিও বিমান বন্দর থেকে উড্ডয়নের সময় থেকেই ফ্লাইট ৪৪৭ এয়ার ফ্রান্সের প্যারিসস্থ ফ্লাইট অপারেশন সেন্টারের সাথে অ্যাকারসের মাধ্যমে যোগাযোগ রক্ষা করছিল। ইতোমধ্যে ফ্লাইট ৪৪৭ থেকে মোট ২৪টি বার্তা এসেছে। এয়ার ফ্রান্স ফ্লাইট অপারেশন সেন্টার লক্ষ্য করলো, বিমানটি কমিউনিকেশন  ডেড জোনে প্রবেশ করার পরও অ্যাকার্স এর মাধ্যমে বার্তা প্রেরন করেছে। তাই একজন অপারেটর বিমানটির সিষ্টেমে একটি বার্তা পাঠালেন। কিন্তু বার্তাটি সাথে সাথে ফেরৎ এল এবং অ্যাকারস জানালো যে প্রাপককে পাওয়া যাচ্ছে না। এটি অত্যন্ত অস্বাভাবিক একটি ঘটনা বিধায় অপারেটর এয়ার ফ্রান্স হেডকোয়ার্টারকে ফ্লাইট ৪৪৭ নিখোজের বিষয়টি জানালেন।

১লা জুন ২০০৯, সকাল হতে না হতেই সমগ্র বিশ্ব এয়ার ফ্রান্সের এই বিমান নিখোজ হওয়ার বিষয়টি জানতে পারল। বাণিজ্যিক বিমান চলাচল ইতিহাসে এটি ছিল একটি বিষ্ময়কর ঘটনা। সমগ্র বিশ্বই অবাক হয়েছিল এই ভেবে যে একটি অত্যাধুনিক ও নিরাপদতম বিমান বিশ্বের সবচাইতে কুশলী পাইলটদের নিয়ন্ত্রনে থাকা অবস্থায় কি ভাবে নিখোঁজ হয়।

১লা জুন সকালে আটলান্টিকের উভয় প্রান্তে ব্রাজিল ও ফ্রান্সের উদ্যোগে এয়ার ফ্রান্স ফ্লাইট ৪৪৭ এর জন্য অনুসন্ধান শুরু হয়। পরবর্তীতে ষ্পেন ও যুক্তরাষ্ট্র এই অনুসন্ধানে যোগ দেয়।

এয়ার ফ্রান্স ফ্লাইট এএফ ৪৪৭ মধ্য আটলান্টিকে বিধ্বস্ত হয়েছে এই অবিশ্বাস্য সংবাদে সমগ্র বিশ্ব জুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি হয় এবং একটি প্রশ্নই সবার মনে আসে অত্যাধুনিক একটি বিমান অত্যন্ত দক্ষ ক্রুদের পরিচালনায় উড্ডয়নরত অবস্থায় কোন ধরনের সংবাদ না দিয়েই কিভাবে বিধ্বস্ত হয়। অনেকেই বিশ্বাস করতে শুরু করেন যে হয়তো বিমানে পেতে রাখা কোন বোমার বিস্ফোরনে বিমানটি বিধ্বস্ত হয়েছে। অনেকেই বলতে থাকেন, বিমানটির যাত্রাপথের প্রচন্ড ঝড় বিমানটিকে হঠাৎ করে দু টুকরো করে ফেলায় কোন কিছু বোঝার আগেই তা আটলান্টিক সমুদ্রে পরে তলিয়ে গেছে। এএফ ৪৪৭ এর পরিনতি নিয়ে যে যাই  ভাবুক না কেন, নিশ্চিতভাবে তার নিখোজ হওয়ার কারনটি বলার মত কোন তথ্যই কারও কাছে ছিল না।

১লা জুন ২০০৯ বিকেলে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট নিকোলাই সারকোজি সরকারীভাবে ফ্লাইট ৪৪৭ দুর্ঘটনার কথা প্রকাশ করলেন এবং যাত্রী ও ক্রু সহ বিমানটির মোট ২২৮ জন আরোহীর মৃত্যুর কথা স্বীকার করলেন।

২রা জুন ২০০৯ সকালে ব্রাজিল ও ফ্রান্সের উদ্যোগে মধ্য আটলান্টিকে ফ্লাইট ৪৪৭ এর সম্ভাব্য সর্বশেষ অবস্থানে ব্যপক তল্লাশী অভিযান শুরু হল। ব্রাজিলিয়ান বিমান বাহিনীর বিমানগুলো ফারনাডো ডি নরনহা আর্কিপেলেগো অন্চলে এবং সেনেগালস্থ ফরাসী বিমান ঘাটি থেকে ফরাসী যুদ্ধ বিমান সমূহ ডাকার উপকুলে  অনুসন্ধান শুরু করল। যুক্তরাষ্ট্রের অ্যান্টি সাবমেরিন প্যাট্রল বিমান পি ৩ অরিয়ন এবং ষ্পেনীয় বিমান বাহিনীর একটি কাসা-২৩৫ সামুদ্রিক পেট্রোল বিমান এই অনুসন্ধানে যোগ দিল।

২রা জুন ইউটিসি সময় বিকাল তিনটা বিশে ব্রাজিলীয় বিমান বাহিনীর একটি বিমান সমুদ্রে একটি বিমানের ধংসাবশেষ  চিন্হিত করে। এই দিন বিকেলে ব্রাজিলের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী ফ্লাইট ৪৪৭ এর দূর্ঘটনার বিষয়টি নিশ্চিত করেন। ব্রাজিলের তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হোসে আলেসকার তিনদিনের জাতীয় শোক ঘোষনা করেন।



দ্বিতীয় পর্বে সমাপ্ত